Tuesday, August 24, 2021

শরণার্থীর আড়ালে

আয়লান কুর্দির কথা মনে আছে? হ্যাঁ, সেই বাচ্চাটার কথাই বলছি সাগরপাড়ে যার মৃতদেহ দেখিয়ে, ইউরোপবাসীদের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল সিরিয়ার মুসলিম শরণার্থীদের জন্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দরজা খুলে দেয়ার জন্যে। জার্মানিও খুলে দিয়েছিল নিজেদের সীমান্ত আর স্রোতের মত ঢুকেছিল শরণার্থীরা এবং পরিণতিতে, তাদের ধর্মানুভুতি আহত হচ্ছে বলে, জার্মানির বহু যায়গাতেই মহিলাদের বিকিনি পরার প্রতিবাদ করেছিল তারা। ছেলের মৃতদেহের সুবাদে বিখ্যাত ও লন্ডনে আশ্রয় পাওয়া আয়লানের বাবা আবেদন জানিয়েছিল যাতে অন্যান্য দেশগুলো শরণার্থীদের প্রতি আরও সহৃদয় হয়।


এরপর আসলো রোহিঙ্গা মুসলমান। মায়নমারে তাদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার গল্প আর তাদের দেশত্যাগের ছবি ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বজুড়ে। ডিঙি নৌকায় তাদের অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়ার আর নৌকাডুবির গল্প শুনে শিউরে উঠলাম আমরা। কোন জাদুবলে তারা ভারতে সীমান্ত নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, পৌছে গেল দিল্লী, হরিয়ানা, কাশ্মীর অবধি। এরপর, কেন্দ্র সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যখন নোটিশ জারি করে, তাদেরকে দেশের নিরাপত্তার প্রতি বিপজ্জনক বললো, তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত। দেশের রাজধানীতে, জনগণের ট্যাক্সের টাকায়, বিশাল বিশাল বাংলোর অধিবাসী আদালতের মহামান্য বিচারপতিরা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে লম্বা আদেশ দিলেও তাদের একজনও কিন্তু নিজেদের বাংলোর অব্যবহৃত যায়গায় একটা রোহিঙ্গা পরিবারকেও বসাতে আগ্রহী হলেন না। ঝাড়ের বাঁশকে সেধে গাঁ* কে বা নিতে চায়!


এখন আবার এসেছে তালিবান উপদ্রুত অঞ্চলের শরণার্থীদের ঢল। কাবুল এয়ারপোর্ট আর বিমান থেকে পড়ে যাওয়ার ছবি দেখিয়ে জমি ইতিমধ্যেই তৈরী আর প্রতিবেশী দেশগুলিকে, আফগান শরণার্থীদের নেয়ার জন্যে সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে, বীজ ফেলার কাজও শুরু করে দিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে আফগানিস্তান এখন হিন্দু শূন্য।


কখনও সিরিয়ান, কখনও রোহিঙ্গা আর কখনও আফগানদের দেখিয়ে এই খেলা চলতেই থাকবে। উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা দ্বারা, অন্যের জমি দখল করার এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ধর্মীয়। পবিত্র গ্রন্থ অনুসারে, এই পদ্ধতির নাম হিজরাত। শরণার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় খেয়াল করে দেখুন, অঙ্কটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আর তারপরেও যদি আপনি মানবাধিকারের ভেক ধরতে চান তাহলে অভিনন্দন, আপনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে সুন্নত আর হিজাব সুনিশ্চিত করে ফেলেছেন।

Saturday, August 21, 2021

কল্যাণ সিং

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, unsung hero, এটার বাংলা কি জানিনা তবে অখ্যাত নায়ক বলা যেতে পারে। রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সেই unsung hero হলেন কল্যাণ সিং। মন্দির আন্দোলনে আদবানী, উমা ভারতী, বিনয় কাটিয়ার, এমনকি সাধ্বী ঋতম্ভরাও এক সময় যতটা প্রচার পেয়েছিলেন তার কণামাত্র পাননি কল্যাণ সিং অথচ ভারতের স্বাভিমানের উপর কলঙ্কচিহ্ন হয়ে থাকা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্যে তিনি নিজের সরকারকে বিসর্জন দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।


কংগ্রেসের সমর্থনে, কেন্দ্রে যখন দেবেগৌড়ার সরকার গঠিত হয় তখন রাজ্যপাল রমেশ ভান্ডারীকে ঘুটি বানিয়ে, বরখাস্ত হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত কল্যাণ সিং-এর সরকার এবং বসানো হয় জগদম্বিকা পাল নামের এক পুতুলকে। তিন রাত্রি ক্ষমতায় থাকাকালীন জগদম্বিকা কত লক্ষ টাকার ফোনের বিল তোলেন সেটা, সেই সময় যারা রাজনৈতিক খবরাখবর রাখতেন, তাদের মনে আছে। যদিও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী, রাজনাথ সিং, কল্যাণ সিং-এর মন্ত্রীসভাতেই শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে প্রথম প্রচারের আলোয় আসেন কিন্তু রাজনাথের 'কড়ি নিন্দা'র সংস্কৃতি কল্যাণ সিং-এর ছিলনা। তাই তিনি রাজ্যপালের অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবার, এবং এখনও অবধি সম্ভবত একবারই, বিধানসভাতে দুইজন মুখ্যমন্ত্রীর যুগপৎ আস্থাভোট নেয়া হয়। সেই ভোটে জগদম্বিকা পালকে হারিয়ে এবং কংগ্রেসের মুখে চুনকালি মাখিয়ে জয়ী হন কল্যাণ সিং। 


কল্যাণ সিং নিজে সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী থেকে রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় আসলেও না নিজের শিকড়কে কখনও ভুলেছেন আর না রাজনৈতিক স্বার্থে সেটার কখনও অপব্যবহার করেছেন। জাতপাতের রাজনীতিতে খন্ডিত উত্তর প্রদেশকে তিনি হিন্দুত্বের সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন। তার মৃত্যু, নিঃসন্দেহে, দেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতার সৃষ্টি করবে। ওম শান্তি!

Monday, August 16, 2021

গোপাল পাঁঠা এবং

মহম্মদ আলি জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'র আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট সংগঠিত গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর রিপোর্ট করতে গিয়ে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের একটি মিলিটারি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, The trouble started early on the morning of the 16th and both sites were equally responsible. The Hindus started putting up barricades at Tala Bridge and Belgachia Bridge and other places to prevent Muslims processions coming into the town and Muslims goondas went round forcing Hindus to close their shops। মানে, দাঙ্গার জন্যে নাকি হিন্দু-মুসলমান, উভয়েই দায়ী ছিল। এরকম সিদ্ধান্তের কারণ হলো মুসলমান গুন্ডারা যখন হিন্দুদের দোকান বন্ধ করতে করতে এগিয়ে আসছিল তখন তাদের প্রতিহত করার জন্যে টাল ব্রিজ, বেলগাছিয়া ব্রিজ সহ অন্যান্য স্থানে হিন্দুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। 


মানে, সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে, হিন্দুদের উচিত ছিল বিনা প্রতিরোধে, জেহাদিদের কাছে নিজেদের যথাসর্বস্ব সঁপে দেয়া। এই দাঙ্গার দুই মাস পরে, নোয়াখালীতে যখন হিন্দুদের উপর জেহাদিরা আক্রমণ করেছিল তখনও বানিয়া গান্ধী বলেছিল যে "হিন্দু রমণীদের দাঁতে দাঁত চেপে ধর্ষণের জ্বালা সহ্য করা উচিত"। এই কথাগুলো খুব চেনা চেনা লাগছে কি? আজ্ঞে হ্যাঁ, এই তত্ত্ব মেনেই, আজও পুলিশকে লাথি মারার পরেও বাড়িতে রেশন পৌছে যায় আর তেলেনিপাড়ার ঘটনায়, স্থানীয় পুলিশ কর্তা, হুমায়ুন কবীরের অপদার্থতা প্রকাশ করার জন্যে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্যেই মহরমের জন্যে দুর্গাপূজার বিসর্জন স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রীতির স্বার্থেই রবি, রুদ্রেশ, কমলেশ তিওয়ারিরা খুন হয়ে যায় কিন্তু NIA-এর দাবী মেনে PFI কে নিষিদ্ধ করা হয়না। সম্প্রীতির কারণেই জমজমের পানি আনার জন্যে বিমানের নিরাপত্তা বিধি বদলানো হয় আর কুম্ভমেলার সময় ভারতীয় রেল টিকিটের উপর অতিরিক্ত সারচার্জ নেয়।


সৌভাগ্যক্রমে, গোপাল পাঁঠা বানিয়া ছিলেননা আর স্বজাতির আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে, সেকুলার সাজার দায়ও তাঁর ছিলনা। তাই বানিয়া গান্ধী তাঁকে অস্ত্র সমর্পণের কথা বললে, মা কালীর ভক্ত বঙ্গসন্তান সেটা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। পাঁঠা কাটার অস্ত্র তিনি অনায়াসে স্বজাতিকে রক্ষা করতে পারেন। হ্যাঁ, এটাই বাঙালীর বিশেষত্ব, তারা যেমন বুক দিয়ে আগলে রাখতে পারে, প্রয়োজন হলে বুকে চেপে বসে দাড়ি উপড়ে ফেলতেও পারে। যে কাঠায় মাপ, সে কাঠায় শোধ দেয়ার মানসিকতা বাঙালীর রক্তে রয়েছে। 

জয় মা কালী।

Sunday, August 8, 2021

ছবি আর বাস্তবতা

রাজনীতিতে দেখনদারির মূল্য অসীম। সেখানে, কেউ কি করছে সেটা বড় নয়, কিভাবে সেটা দেখাচ্ছে, সেটাই প্রধান। ইংরেজিতে এটাকে বলে optics বা ছবি। কোন দলের রাজনৈতিক IT cell এর কাজই হলো এরকম optics তৈরী করা। এই optics এর উপর ভিত্তি করেই, সেটার target people মানে যাদের উদ্দেশ্যে সেটা তৈরী করা হয়েছে, তারা খুশী হয়ে যায় আর দলকে সমর্থন দেয়।


এমনই একটা ছবি গত কয়েকদিন ধরে social media তে দেখা যাচ্ছে যেখানে কাশ্মীরের লালচকে, যেখানে ২০১১ সালে পাকিস্তানের পতাকা দেখা গিয়েছিল সেখানে আজ তিরঙ্গা শোভা পাচ্ছে। দৃশ্যটা নিঃসন্দেহে সব ভারতীয়র কাছেই অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং গৌরবের কিন্তু ছবি দেখে এটা কতজন বুঝতে পারছেন যে ২০১১ সালের ঘটনার সময় লালচক ছিল স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা পরিপূর্ণ আর ২০২১ এ ত্রিবর্ণরঞ্জিত লালচকে কেবল বিশেষ কয়েকজনই উপস্থিত আছেন।


এটাই optics এর মাহাত্ম্য। ছবি দেখে আপনি ভাববেন যে এককালের উপদ্রুত কাশ্মীর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদের জোয়ার এসেছে কিন্তু বাস্তবে ঘটনা মোটেও তা নয়। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা উঠেছে ঠিকই কিন্তু তার ফলে না কাশ্মীরবাসীদের মানসিকতায় কোন বদল হয়েছে না সেখানে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছে। আর সেটা ঘটবেও না যতক্ষণ না পর্যন্ত সেখানে কাশ্মীর থেকে বিতাড়িত হিন্দুদের, উপযুক্ত নিরাপত্তা সমেত পুনর্বাসন দিয়ে, এলাকার জনবিন্যাসের পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে ভারতের যে এলাকাতেই হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়েছে সেই এলাকাগুলিই হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বর্গরাজ্য হয়েছে অথবা দেশ থেকে আলাদা হয়ে গেছে অথচ তারপরেও আমরা শুধু একটা ছবি দেখেই নিজেদের সান্ত্বনা দেই যে all is well in Kashmir। 


এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেয়া যায় যে ১৯৯২ সালের ২৬শে জানুয়ারী, একতা যাত্রার শেষে, বিজেপির তদানীন্তন সভাপতি, মুরলী মনোহর যোশীও লালচকে জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। সেই ছবিও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু যেটা হয়নি সেটা হলো যে নরসিংহ রাও সরকার কিভাবে মিলিটারি দিয়ে লালচককে ঘিরে, চরম সুরক্ষা বলয়ের মাধ্যমে যোশীজি কে নিয়ে গিয়ে, মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ করেছিলেন। সেদিনও আমরা অর্ধসত্য দেখে নিজেদের ভুল বুঝিয়েছিলাম আর আজও সেই কাজই করে চলেছি। কাশ্মীরকে পুনরায় হিন্দু অধ্যুষিত না করতে পারা অবধি যে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান নেই এই সত্য যতদিন পর্যন্ত নিজেরা না উপলব্ধি করতে পারবো, optics আমাদের বিপথে চালিত করতেই থাকবে।

Saturday, July 24, 2021

গুরু পূর্ণিমা

জুড়িয়া চরণ মুদিয়া নয়ন

প্রণমি তোমারে প্রভু,

রহিবে বিবেক সে শুধু আমার

বিকাবো না তারে কভু।


ঈশ্বর আর বিবেক ছাড়া আমার আর কোন গুরু নেই। হ্যাঁ, পথপ্রদর্শক বা অনুপ্রেরণা (অন্যভাবে নেবেন না) অনেক আছে, কিন্তু গুরু নেই। ব্যক্তি গুরুর দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে ভেবে, ডক্টরজী যে কারণে গৈরিক ধ্বজকে সঙ্ঘের গুরু হিসাবে নির্বাচিত করেছিলেন, ছোটবেলায় শোনা সেই কথাই হয়তো অবচেতন মনে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে দিয়েছে।

না, তাই বলে আমি জীবনে গুরুর প্রয়োজনের কথা অস্বীকার করিনা। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হয়তো তাঁর দরকার পড়ে কিন্তু সেক্ষেত্রে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই সব ক্ষেত্রে গুরু মানতে হবে, এটা মানতে পারিনা। বিশেষত সেই গুরুদের তো একদমই গুরুত্বহীন মনে হয় যারা জীবিত অবস্থায় সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে ভক্তদের অবগত না করিয়ে মৃত্যুর পরে কিভাবে মোক্ষলাভ হবে তার উপায় বলেন। ঐহিক জীবনে ধার্মিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ কোন ব্যক্তির পারত্রিক জীবন বৈকুণ্ঠধামে বা শিবলোকে কাটবে বলে আমি বিশ্বাস করিনা।

তাই, ঈশ্বর আর বিবেকই আমার গুরু। ঈশ্বর শক্তি যোগান আর বিবেক সঠিক পথ দেখায়। এই আত্মদীপের আলোতেই যেন সারা জীবন চলতে পারি এটাই মা কালীর কাছে প্রার্থনা। 

সবাইকে গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।

Wednesday, July 7, 2021

আপনি আচরি ধর্ম

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তখন সিংহাসনে বিরাজমান আর তার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আসীন স্বয়ং চাণক্য, গ্রীকদের পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত তখন চক্রবর্তী সম্রাট, এমন সময়ে ভারতে এলেন গ্রীক পর্যটক, মেগাস্থিনিস। ভারতে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই তিনি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেরালেন। রাজকর্মচারী থেকে প্রজা- সবার সাথেই কথাবার্তা বললেন। আর সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলার তিনি উপলব্ধি করলেন যে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি হলেন চাণক্য। তাই তিনি চাণক্যর সাথে একদিন দেখা করার জন্যে সময় চাইলেন।

অতিথিকে দেবতা হিসাবে দেখা দেশে, মেগাস্থিনিসের আবেদন মঞ্জুর হতে দেরী হলনা। গ্রীক পর্যটককে জানিয়ে দেয়া হলো যে প্রধানমন্ত্রী কবে আর কখন, নিজ বাসগৃহে, তার সাথে দেখা করবেন। নির্দিষ্ট দিনে, সন্ধ্যার সময়, মেগাস্থিনিস উপস্থিত হলেন চাণক্যর বাড়িতে। তাকে দেখে, চাণক্য একটু অপেক্ষা করতে বলে, রাজসভার কিছু কাজ সেরে, তাকে ডাকলেন। মেগাস্থিনিস চাণক্যকে যথোচিত অভিবাদন করে বললেন যে তিনি চাণক্যর বিষয়ে অনেক কিছু শুনেছেন, তাই তাঁকে কিছু প্রশ্ন করতে চান। তার এই প্রস্তাব শুনে চাণক্য তাকে প্রতিপ্রশ্ন করলেন যে তিনি তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করতে চান নাকি রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সাথে। এই কথা শুনে মেগাস্থিনিস বললেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী নয়, ব্যক্তি চাণক্যর সাথেই কথা বলতে আগ্রহী।

মেগাস্থিনিসের উত্তর শুনে, চাণক্য তাঁর পাশে জ্বলা প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে, পাশের আরেকটা প্রদীপ জ্বালিয়ে তাকে প্রশ্ন শুরু করতে বললেন। মেগাস্থিনিস বললেন যে, "এটাই আমার প্রথম প্রশ্ন যে আপনি ঐ প্রদীপটা নিভিয়ে, আরেকটা প্রদীপ কেন জ্বালালেন"? তার প্রশ্ন শুনে চাণক্য মৃদু হেসে বললেন যে, "আমি যে প্রদীপটা নিভালাম সেটার তেল খরচ রাজ্যের কোষাগার থেকে আসে। আমি এতক্ষণ রাজকার্য করছিলাম, তাই ঐ প্রদীপ জ্বলছিল। আপনি আমার সাথে ব্যক্তিগত আলাপের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তাই ঐ প্রদীপটা নিভিয়ে, এটা জ্বালালাম কারণ এটার তেল খরচ আমার প্রাপ্ত সাম্মানিক দিয়ে হয়"। এই কথা শুনে মেগাস্থিনিস বললেন যে আমার আর কোন প্রশ্ন নেই। সবাই চাণক্যর কথা কেন বলে সেটা আমি বুঝে গেছি।

ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীতটা একটু দীর্ঘ হয়ে গেল কিন্তু ঘটনা হচ্ছে যে মমতা ব্যানার্জী নন্দীগ্রামের ফল নিয়ে যে মামলা করেছেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়, মুখ্যমন্ত্রীর বিষয় নয়। তাই এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে এই মামলার খরচ এবং জরিমানা, যদি দেয়া হয় এবং না দিয়ে যদি ফের সুপ্রিম কোর্টে যান সেক্ষেত্রেও যে খরচ সেটা কে বহন করছে, মমতা ব্যানার্জী নিজে নাকি রাজ্যের কোষাগার? 

Monday, June 21, 2021

আমার চোখে পশ্চিমবঙ্গ দিবস

আচ্ছা, ধরুন আমার বাড়িতে চোর ঢুকে, বেশ কিছু জিনিস নিয়ে পালাচ্ছিল। এমন সময় আমি সজাগ হয়ে গেলাম এবং চোরকে তাড়া করলাম। তাড়া খেয়ে পালাবার সময়, আমার সাথে ধাক্কাধাক্কিতে, চোরের ঝোলা থেকে, আমার বাড়ি থেকেই চুরি করা একটা মোবাইল পড়ে গেল আর আমি, চোরকে ধরতে না পারলেও, একটা মোবাইল ফেরত নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। এমতাবস্থায়, আমি কি সেই মোবাইলটা পেয়েছি বলে উল্লসিত হবো নাকি বাকি জিনিস হারানোর জন্যে দুঃখিত হবো এবং সেগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবো?

না, পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারছিনা কারণ এটাও, আমার কাছে, সেই পড়ে যাওয়া মোবাইলের মতই, আংশিক প্রাপ্তি। আচ্ছা, জেহাদি হাত থেকে ছিনিয়ে আনা নিজেদেরই অংশ নিয়ে যদি রাজ্যের জন্মদিন পালন করতে হয়, তাহলে কি ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ কে ভারতের জন্মদিন হিসাবে ধরতে হবে? আমাদের দেশের ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ইত্যাদি তাহলে মাত্র সত্তর বছরের? তাহলে তো বলতে হবে যে নেহরু ঠিকই বলেছিলেন যে India is a nation in making। না, নেহরু ঠিক বলেননি, ভারতের জন্ম মোটেই ১৯৪৭ সালে নয়, রাজনৈতিক বিভাজন মোটেই দেশের জন্মদিন নির্ধারণ করেনা।

একইভাবে, বঙ্গমাতার জন্মদিনও মাত্র কয়েক দশকের পুরনো ঘটনা নয়। মা কে খন্ডিত করলেই তার জন্মদিন বদলে যায়না। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ, মাস্টারদার স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম, মাইকেল মধুসূদন দত্তের যশোর প্রভৃতি স্থান বিহীন বঙ্গমাতা আজও খন্ডিতা। তাই, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, মা যা ছিলেন আর মা যা হবেন, আমি সেটার স্বপ্ন দেখি, মা যা হয়েছেন, সেটা নিয়ে উল্লসিত হতে পারিনা। তাই আমার কাছে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি উল্লাসের নয়, বেদনার স্মৃতি বয়ে আনে। বিজাতীয় আরবী সংস্কৃতির কাছে পরাজয়ের বেদনা, নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী ভূমিখণ্ড হারানোর বেদনা, নিজের মাতৃভূমিকে জেহাদিদের হাতে খন্ডিত হতে দেয়ার বেদনা। আর এই বেদনার উপশম সেদিন হবে যেদিন আমরা মায়ের খন্ডিত অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারবো। আমার মা পূর্ব আর পশ্চিমে বিভক্ত নয়, তিনি সম্পূর্ণা।

Saturday, June 19, 2021

কালনেমির লঙ্কাভাগ

জাতীয় সুরক্ষার নামে পশ্চিমবঙ্গের বিভাজন করার পরিকল্পনা আসলে বিজেপির রাজনৈতিক হতাশার প্রতিফলন। বিগত বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকে, সম্পূর্ণ কম্যুনিস্ট কায়দায়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ গড়ে তোলার কাজ করে চলেছে বিজেপি। কম্যুনিস্টদের শ্রেণীশত্রুর অনুকরণে, বিজেপি জন্ম দিয়েছে জাতিশত্রুর। বাঙালীর সাথে অবাঙালীর, জেলার সাথে শহরের, এমনকি একই এলাকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে, পারস্পরিক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ করে গেছে বিজেপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি। এককালে এই পদ্ধতি নিয়েছিল বামপন্থীরা। কৃষকের সাথে জমির মালিকের দ্বন্দ্ব, শ্রমিকের সাথে কারখানা মালিকের দ্বন্দ্ব, ছাত্রের সাথে শিক্ষকের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। অথচ মজার কথা হলো, বিরোধরত প্রতিটা পক্ষেরই প্রতিনিধিত্ব করতো বামপন্থীরা। পশ্চিমবঙ্গে, নির্বাচনের আগে, বিজেপিও ঐ একই লাইন নিয়েছিল।

সমাজের এই ভেদাভেদকে কাজে লাগিয়ে, বিজেপি ভেবেছিল, বিরাট সাফল্য পাবে। কিন্তু নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর যখন সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় তখন সেটা গ্রহণ করা তাদের পক্ষে সহজ হয়না। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ছিল মোদী আর শাহর কাছে সম্মান রক্ষার লড়াই আর সেই লড়াইয়ে, অযোগ্য নেতাদের উপর নির্ভর করে, মোদী আর শাহ সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত। এই ফলাফলে তাদের হাত থেকে শুধু পশ্চিমবঙ্গই হাতছাড়া হয়নি, জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। আর ঠিক এই কারণেই, ফল প্রকাশের পর, রাজ্যপাল হোক বা সিবিআই, বিজেপির হাতে যা অস্ত্র আছে, সেগুলো বিজেপি প্রয়োগ করে যাচ্ছে যাতে মমতা ব্যাকফুটে থাকেন। 

এই খেলারই নতুন অঙ্গ হলো পশ্চিমবঙ্গকে ত্রিখন্ডিত করার প্রস্তাব। 'জাতীয় সুরক্ষার' স্বার্থে নাকি এটা আবশ্যিক। তাই গোর্খাল্যান্ড, জঙ্গলমহল আর মধ্যভূমি নিয়ে, রাজ্যকে তিন টুকরো করার প্রস্তাব হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। বিজেপির মতে, হিমালয় থেকে সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের একমাত্র রাজ্যকে তিন টুকরো করে দিলেই নাকি 'অপুত্রকের পুত্র হবে আর নির্ধনের ধন, মর্তে স্বর্গসুখ, মরলে বৈকুন্ঠ গমণ' একদম নিশ্চিত। গতকাল বিজেপির এক নেতার সাথে এই বিষয়ে কথা চলাকালীন তিনি বললেন যে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে, রাজ্যকে ভেঙে, তিনটে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা নাকি আশু প্রয়োজন। আমি যখন পালটা জানতে চাইলাম যে বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত তো আসাম আর ত্রিপুরারও আছে, সেখানেও কি একই পদক্ষেপ নেয়া হবে? তখন তার উত্তর যে ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা।

আসলে পশ্চিমবঙ্গে পরাজয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। আর যে পরিমাণ অর্থ তারা খরচ করেছে, সেটার পর মেনে নেয়াও খুব সহজ নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা হোসপাইপে করে অর্থ ঢেলেছেন ঠিকই কিন্তু সেটা ঠিক যায়গায় পড়েছে কিনা সেটা নিয়ে তারা চোখ বুজে ছিলেন। আজ যখন চোখ খুলেছে তখন দেখছেন যে টাকাও নেই আর ক্ষমতাও নেই। কেন্দ্রে এককভাবে ৩০৩ জন সাংসদ আর খোদ এই রাজ্য থেকে ১৮ জন সাংসদ থাকলেও রাজ্যের নেতারা নিজেরা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তার আড়ালে লুকিয়ে আছেন। নিজেদের আরামদায়ক ঘরে বসে, কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার কথা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বড় বড় কথা বলে আর আক্রান্তদের ছবি দেখিয়ে টাকা তুলেই তাদের দৌড়ে শেষ। রাজ্য নেতারা একে অপরের নামে বিষোদগার করে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেরই অভিযোগ যে অন্যজন টাকা খেয়েছে। এমতাবস্থায়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর কাছে কুমিরের শেষ বাচ্চা হলো রাজ্য ভাগ। তারাও জানে যে দলদাসরা, সব ভুলে, আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই তো সেই নেতা অনায়াসেই বলতে পারেন যে, "লোকসভা নির্বাচন আসতে তো এখনও তিন বছর বাকি। ততদিনে সবাই সব কিছু ভুলে যাবে"।

Thursday, June 17, 2021

আগামীর রাজনীতি

উপর্যুপরি তিনবার পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে জেতার পর, এবার, খুব স্বাভাবিকভাবেই, মমতা ব্যানার্জীর কাছে পাখির চোখ হল দিল্লীর মসনদ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে ২০১৪ তে বিজেপির প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী হওয়ার আগে, নরেন্দ্র মোদীও তিনবার তার দলকে গুজরাট বিধানসভাতে বিজয়ী করেছিলেন। তবে নরেন্দ্র মোদীর মত মমতা ব্যানার্জী কোন সর্বভারতীয় দলের নেত্রী নন, তার সঙ্গে শারদ পাওয়ারের সামঞ্জস্য বেশী। পাওয়ার যেমন মহারাষ্ট্রকে ভিত্তি করে, সর্বভারতীয় স্তরে উঠেছিলেন, মমতাও একইভাবে, পশ্চিমবঙ্গকে ভিত্তি করে, জাতীয় রাজনীতিতে নিজের যায়গা বানাতে চাইবেন।

বিগত নির্বাচনে ব্যপক সাফল্য লাভের পর, মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে তৃণমূল প্রথমেই চাইবে বঙ্গ বিজেপিকে ছত্রভঙ্গ করে দিতে আর এই কাজে প্রধান সেনাপতি হবেন মুকুল রায় - দলবদল ও দলভাঙানোর খেলাতে যিনি প্রায় কিংবদন্তির পর্যায়ে পৌছে গেছেন। একটা জিনিস এখানে খেয়াল রাখবেন, প্রধান সেনাপতি বলেছি, রাজা নয়। কারণ এক্ষেত্রে রাজার ভূমিকা নেবেন অভিষেক ব্যানার্জী, যিনি খুব সন্তর্পণে যুব তৃণমূল থেকে মূল ধারায় যুক্ত হয়ে গেছেন। বঙ্গ বিজেপিকে ভাঙার সাথে সাথে, তৃণমূলের লক্ষ্য হবে ত্রিপুরা, ঝাড়খণ্ড এবং আসাম সহ দেশের বিভিন্ন বাঙালী বহুল এলাকায় নিজেদের প্রভাব বিস্তার করা। তৃণমূলের বাড়তি সুবিধা হল যে আগামী এক বছর পার্টির যাবতীয় নজর থাকবে উত্তর প্রদেশের দিকে, তাই পশ্চিমবঙ্গে পার্টির অবস্থা সামলানোর লোক খুবই কম।

একটা বিষয় এখানে উল্লেখ করার প্রয়োজন আছে যে বিগত ছয়-সাত মাসে নরেন্দ্র মোদী সরকারের কাজকর্মের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের চরম অভাব দেখা যাচ্ছে। কৃষক আন্দোলন হোক বা নতুন IT আইন, সরকারের অসহায়তা প্রতি ক্ষেত্রেই ফুটে উঠছে। ভাবা যায়, বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলের কৃষকদের মধ্যে এমন প্রভাব নেই যা আন্দোলনের গতিধারা নির্ধারণ করতে পারে! নরেন্দ্র মোদীর মুশকিল হচ্ছে যে না তিনি খুব বেশী সহযোগীকে বিশ্বাস করেন না খুব বেশী সহযোগী তাকে বিশ্বাস করেন। এই কারণেই তার পীযুষ গোয়েল বা নির্মলা সীতারামনকে ক্ষমতার অতিরিক্ত দায়িত্ব বহন করতে হচ্ছে।

তবে তৃণমূলের এই পরিকল্পনা যতটা সহজে বললাম, অতটা সহজে বাস্তবায়িত হবেনা তার প্রধান কারণ প্রধানমন্ত্রী পদে নরেন্দ্র মোদীর ইমেজ। এখনও অবধি বিরোধী দলগুলি যার কোন বিকল্প তুলে ধরতে পারেনি। মমতা ব্যানার্জী পশ্চিমবঙ্গে অসম্ভব জনপ্রিয় হতে পারেন কিন্তু এখনও অবধি তার সর্বভারতীয় ইমেজ মোদীর তুলনায় নগন্য। মোদীর যেভাবে গুজরাট মডেলের বিকাশ দিয়ে সারা ভারতে জনপ্রিয় হয়েছিলেন মমতাও, আগামী তিন বছর, একইভাবে, চাইবেন রাজ্যের উন্নয়নকে মার্কেটিং করতে আর তিনি যাতে সেই কাজে সফল না হন তাই মমতা ব্যানার্জীর ইমেজের উপর বারবার আক্রমণ হবে, কখনও নারদা কেস নিয়ে বা কখনও রাষ্ট্রপতি শাসন নিয়ে যাতে মমতাকে সবসময় ব্যাকফুটে খেলতে হয়।

তাই, আপনারা তৈরী থাকুন, ২০২৪ এর নির্বাচন, যেকোন রাজনীতির ছাত্রর কাছে, একটা শিক্ষনীয় বিষয় হতে চলেছে। মোদী আর মমতার দ্বৈরথ যে খুবই আকর্ষণীয় হতে চলেছে সেটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।

Thursday, June 10, 2021

সহী হিন্দু

অনেক ভেবেচিন্তে দেখলাম যে ভারতে সহী হিন্দু যদি কেউ থেকে থাকে তাহলে সেটা একমাত্র বাঙালী, অন্য কেউ নয়। এটা শুনে আশ্চর্য হবেননা, বরং ভেবে দেখুন, সহমত হবেন। আচ্ছা, একটু বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করি।

দেখুন, হিন্দুরা কোনদিন বলপূর্বক কারুর জমি দখল করতে যায়নি, বরং শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার জন্যেই হোক বা আক্রমণকারীদের হামলার ফলে নিজেদের জমির অধিকার হারিয়েছে। বাঙালীদের ক্ষেত্রেও দেখুন একই অবস্থা। দেশভাগ হোক বা ল্যান্ড বিল এগ্রিমেন্ট -নিজের জমি ছাড়তে বাঙালী সবার আগে। এমনকি অন্য দেশ বা রাজ্য থেকে ব্যক্তিদের জমি ছাড়তে ছাড়তে, নিজেরা বাস্তুচ্যুত হলেও বাঙালীর কোন হুশ নেই।

এবার আসুন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। এককালে সারা বিশ্বে সনাতন ধর্মের যে প্রভাব বিস্তৃত হয়েছিল সেটা হয়েছিল মূলতঃ সাংস্কৃতিক কারণে। একইভাবে, বাঙালীরাও বিশ্বাস করে যে রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ আর নন্দন দিয়েই তারা সারা বিশ্বকে জয় করতে পারবে। আপনি দেশের যেকোন রাজ্যে যান, সেখানে বিহার বা উত্তর প্রদেশের মূলগত জনগোষ্ঠী যেখানে বাস করে সেটা সেখানকার পরিবেশ দেখে নিজেই বুঝতে পারবেন। এমনকি ওড়িয়া বা তামিল অধ্যুষিত এলাকাতেও একই যুক্তি প্রযোজ্য। কিন্তু কোন যায়গা বাঙালী অধ্যুষিত হলে সেখানকার আলাদা কোন পরিচয় গড়ে ওঠেনা।

একইভাবে, বিজাতীয় সংস্কৃতিকে আপন করতে, যেটা বসুধৈব কুটুম্বকমের ভিত্তি, বাঙালীর কোন জুড়ি নেই। তাই বিরিয়ানি থেকে খৈনী, ধোকলা থেকে গুটকা - সবেতেই তার চরম উৎসাহ কিন্তু যাবতীয় বাছবিচার শুরু হয় মাছ খাওয়ার ক্ষেত্রে। মহরমের তাজিয়ায় বাঙালী হিংসা না দেখলেও চড়কের ঘূর্ণী তাকে ব্যথিত করে। মাংসের দোকানে লাইন দিয়ে, আড়াই পোচে কাটা মাংস কিনতে তার আপত্তি না থাকলেও বলিপ্রথা তার কাছে চরম নিষ্ঠুরতার নিদর্শন।

পরমতসহিষ্ণুতার চরম নিদর্শন দেখিয়ে বাঙালী রামনবমীতে টিনের তলোয়ার আর DJ নিয়ে মিছিল করতে পারে কিন্তু কাংলাপাহাড়িতে দুর্গাপূজা বা তেহট্টে সরস্বতী পূজা বন্ধ হলে তার কিছু এসে যায়না। ধুপের মত সে নিজেকে পুড়িয়েই অন্যকে খুশী করতে চায়। আর এই প্রবৃত্তিই তাকে এতটা পরনির্ভরশীল করে দিয়েছে যে যেকোন আগ্রাসনের সময় সে অন্যদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকে, নিজে এগোতে পারেনা। এরপরেও কি বাঙালীদেরই একমাত্র সহী হিন্দু বলা যাবেনা?

Sunday, June 6, 2021

টিকা নেয়ার শিক্ষা

অবশেষে বিড়াল, থুড়ি, আমার ভাগ্যেও শিকে ছিঁড়লো, মানে টিকা জুটলো। পরশুদিন বিকালে দেখলাম যে সোদপুরের সুরক্ষা ডায়গনিস্টিক সেন্টারে আজকের স্লট খালি আছে। অতএব, করে দিলাম কর্তাগিন্নির বুকিং।

সকাল ১০-১১টার স্লট বুক করা ছিল। আজ ওখানে,অর্পিতাকে নিয়ে, ১০ঃ৩০ নাগাদ পৌঁছে দেখলাম লম্বা লাইন। লাইনে দাঁড়িয়ে শুনলাম যে সকাল ৯টার স্লটে বুকিং করা অনেকেই তখনও টিকা পাননি। সিড়ির ঘর হয়ে লাইনটা সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেছে। লাইনে, পুরুষ আর মহিলা নিয়ে প্রায় জনা চল্লিশেক দাঁড়িয়ে। এদের মধ্যে বেশ কয়েকজন সিনিয়র সিটিজেনও আছেন। আধঘন্টাখানেক দাঁড়িয়ে থাকার পরেও উল্লেখযোগ্য স্থান পরিবর্তন হলনা। লাইনে সবাই এই ধীর গতিতে কাজ হওয়া থেকে শুরু করে মোদীর টিকানীতি - সবকিছু নিয়েই আলোচনা করছে কিন্তু তাতেও লাইন এগিয়ে চললো না। বুঝলাম যে লাইনে দাঁড়িয়ে, আলোচনা করে গায়ের ঝাল মিটতে পারে কিন্তু কাজের কাজ কিছু হবেনা। অতএব বাধ্য হয়েই, লাইনে এড়িয়ে ভিতরে ঢুকলাম।

ভিতরে গিয়ে, সেন্টারের ইনচার্জ কে আছেন জানতে চাওয়ায় প্রথমে উপস্থিত কয়েকজন কর্মচারী মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন আর তারপর একজন জন মহিলা বললেন যে তিনি আজকে দায়িত্বে আছেন। আমি তাকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলাম যে এতজন লোক, এতক্ষণ ধরে, এভাবে দাঁড়িয়ে আছে, তাদের বসার কোন ব্যবস্থা নেই কেন? উত্তরে উনি অসহায়ের মত বললেন যে "আমাদের এত লোককে বসতে দেয়ার মত পরিকাঠামো নেই"। পরিকাঠামো নেই তাহলে স্লট নিলেন কেন? টিকা বেচে আয় করবেন আর ক্রেতাদের ন্যুনতম স্বাচ্ছন্দ্যের কথা মাথায় রাখবেন না, এটা তো হয়না - উত্তর দিলাম আমি। আমার কথা শুনে ভদ্রমহিলা বললেন যে আপনি চলুন স্যার, আপনারটা করিয়ে দিচ্ছি। মাথাটা গরম হয়ে গেলেও, খুব ঠান্ডা স্বরেই বললাম যে, অসুবিধাটা শুধু আমার নয়, অন্যদেরও হচ্ছে। ওভাবে ঘেষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে থাকলে, এখান থেকেও রোগ ছড়াতে পারে, আপনি সেটার দায়িত্ব নিচ্ছেন তো? ভদ্রমহিলা আমতা-আমতা করে বললেন যে, "আসলে আজকে তো রবিবার, তাই কর্মী সংখ্যা কম। তাছাড়া, কম্পিউটারে বিল বের করতেও কিছু অসুবিধা হচ্ছে"। কম্পিউটারে বিল করতে অসুবিধা হলে, হাতে লেখা বিল দিন, আমি বললাম। আমরা তো টিকা নিতে এসেছি, বিল নয়। টিকাকরণ শেষ হয়ে গেলে নাহয় কম্পিউটারে আপডেট করে নেবেন। আর একটা এক্সেল শীটে এক থেকে পঞ্চাশ অবধি তালিকা প্রিন্ট নিয়ে সবাইকে দিয়ে দিন। সবাই আলাদা যায়গায় বসুক, যখন যার নম্বর আসবে, সে ডাক পাবে।

মজার কথা হলো যে আমি যখন সবার হয়ে সেন্টারের সাথে তর্ক করছি তখন উপস্থিত আর কেউ আমার সমর্থনে এগিয়ে আসলো না। বুঝলাম, এদের ক্ষোভও সেই শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রতি প্রতিবাদ করার মতো। যাইহোক, ভদ্রমহিলা তারপর দু'জনকে ডেকে কিছু বললেন আর আমাকে আবার অনুরোধ করলেন আগে টিকা নিয়ে নিতে। আমি আর ওনার কথা ফেললাম না, উপরে গিয়ে, হ্যাঁ, লাইনে থাকা বাকিদের আগেই, দুজনের টিকার দাম দিয়ে, টিকা নিলাম। ও হ্যাঁ, এবার হাতে লেখা বিলই দেয়া হলো। টিকা নেয়ার পরে, কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর যখন নেমে আসছি তখন সিড়িতে দেখলাম তিন-চারজন দাঁড়িয়ে আছেন আর সেন্টারের অন্য একটা অংশ খুলে দেয়ায়, বাকিরা সেখানে বসে আছেন। আর কি, দু'জনে হাসতে হাসতে গাড়ির দিকে চললাম।

Monday, May 31, 2021

বিজেপির হতাশা

নারদা কান্ডে চার্জশিট পেশের সময় গ্রেপ্তারি হোক বা মুখ্যসচিব পদে এক্সটেনশন দেয়ার পর বদলির আদেশ, এসবই আসলে অমিত শাহর হতাশার বহিঃপ্রকাশ মাত্র। তিনি এখনও ভাবতেই পারছেননা যে রাজ্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে, চলতি ভাষায়, মুরগী বানিয়ে, নিজেদের পকেট ভারী করেছেন। পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে, বিজেপি নিজেদের যাবতীয় শক্তি ঢেলে দেয়ার পরেও যে ফল হয়েছে তা নিঃসন্দেহে বিপর্যয়। 

আসলে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অবস্থা অনেকটা বলিউডে ক্যাটরিনা কাইফের মত হয়েছে। দীর্ঘদিন বলিউডে কাজ করার পরেও, ক্যাটরিনার হিন্দি উচ্চারণ এতটাই যান্ত্রিক যে এখনও তিনি খাঁটি ভারতীয়র ভূমিকায় খাপ খাওয়াতে পারেননা। তাকে যদি কোন সিনেমায় 'গাঁও কি গোরী' হিসাবে দেখানো হয় তাহলে সেই সিনেমার পরিণতি কি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। এই কারণে চিত্রনাট্য তৈরীই করা হয় তাকে প্রবাসী ভারতীয় হিসাবে দেখাতে। প্রায় একইরকম সমস্যা ছিল বাংলা সিনেমাতে অরুন্ধতী দেবীর। তার অ্যাপেয়ারেন্সটা এতটাই বনেদী ছিল যে তাকে গ্রামের কোন সরল, সাধাসিধা মেয়ের ভূমিকায় মানাতনা। এই নিয়ে তিনি নিজেও ক্ষেদ প্রকাশ করেছেন কিন্তু পরিচালকের কিছু করার ছিলনা।

পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির অবস্থাও হয়েছে সেই ক্যাটরিনা কাইফের মত। যাই করুক না কেন, 'জয় শ্রী রাম' না বললে ঠিক কমফোর্ট জোনে যেতে পারেনা। এমনকি কফি হাউসের দখল নিতেও গেছিল গেরুয়া গেঞ্জি পরে। না, কফি হাউস বাংলার সংস্কৃতির একমাত্র প্রতীক নয় কিন্তু যারা সেটার দখল নিতে যাচ্ছে, তারা তো সেটা ভেবেই যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে, যস্মিন দেশে, যদাচার করতে বাধা কোথায়? বাধা সেই ক্যাটরিনা কাইফ। তাকে NRI দেখালে তবে কনফিডেন্স আর কমফোর্ট পায় আর বঙ্গ বিজেপির কনফিডেন্স আর কমফোর্ট হলো গেরুয়া শার্ট আর জয় শ্রী রাম। 

এরইফলে, মমতা ব্যানার্জী ক্রমাগত বিজেপিকে বহিরাগত বলে আক্রমণ করেছেন আর বিজেপিও নিজেদের চেনা ফর্মুলার বাইরে না বেরিয়ে, সেই অভিযোগকেই যথার্থ প্রমাণ করেছে। পশ্চিমবঙ্গে লাভ জেহাদ যে একটা বড় বিপদ সেটা নিয়ে তপন ঘোষ প্রথম যখন সোচ্চার হয়েছিল তখন সেটার মধ্যে মাটির গন্ধ ছিল। কেউ সেটাকে বাঙালী পরিচয়ের প্রতি থ্রেট বলে ভাবেনি। কিন্তু বিজেপি নেতারা যখন তাদের ভাষণে 'অ্যান্টি-রোমিও স্কোয়াড' তৈরীর প্রতিশ্রুতি দেন, বাঙালী তখন সেটার সাথে একাত্ম হতে পারেনা। বরং আতঙ্কিত হয় যে এই রাজ্যকেও বোধহয় বদলানোর ষড়যন্ত্র হচ্ছে।

বঙ্গবিজেপি যতদিন না পর্যন্ত এই ক্যাটরিনা কাইফ সিনড্রোম থেকে বেরোতে পারবে, তাদের পক্ষে সাফল্য পাওয়া কঠিন। অনেকেই হয়তো এটা শুনে ২০১৯ এর ১৮টা আসনের উদাহরণ দেবেন কিন্তু তারা ভুলে যাবেননা যে সেই নির্বাচন হয়েছিল পুলবামা আর বালাকোটের আবহে, জাতীয়তাবাদের প্রেক্ষাপটে। সেই লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির আঞ্চলিক পরিচয়ের থেকেও জাতীয় পরিচয় নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করেছিল। তবে সময় কখনও থেমে থাকেনা। রাজনীতিতে সাফল্য আর ব্যর্থতা - দুই-ই ক্ষণস্থায়ী। ভুল থেকে যে দল তাড়াতাড়ি শিক্ষা নিতে পারবে, তারই লাভ।

Thursday, May 27, 2021

ডিজিটাল দ্বারপাল

ডিজিটাল পৃথিবীতে কোন কিছুই আর গোপন নয়। আপনার করা প্রতিটি বার্তালাপ (conversation), প্রতিটি বিনিময় (transaction) এর ছাপ থেকে যায় সারা জীবনের জন্যে। আপনি হয়তো Incognito অথবা VPN ব্যবহার করে নিজেকে নিরাপদ ভাবছেন কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন যে ব্রাউজার এবং আপনার ব্যবহৃত কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনের ব্রাউজিং ইতিহাসে সেই তথ্যের প্রতিলিপি থেকেই যাচ্ছে। এক্ষেত্রে আপনার বিনিময় করা তথ্যের নিরাপত্তার জন্যে আপনি বিশ্বাস করছেন গুগল, ফেসবুক, ট্যুইটার বা হোয়াটসঅ্যাপের মত কারিগরি দৈত্যদের (technical giants) দেয়া আশ্বাসবাণীর উপরে যে আপনার তথ্য পুরোপুরি encrypted। এবার এই encryption কতটা সত্যি আর কতটা নিরাপদ সেটা নিয়ে আপনি তো ছাড়, কোন সরকারেরও পুরোপুরি ধারণা নেই। এই কারিগরি দৈত্যদের মুখ্যালয়ে, যেখানে বিভিন্ন সার্ভারের মাধ্যমে বিনিময় বা সঞ্চিত হচ্ছে আপনার তথ্য, সেখানে প্রবেশাধিকার রয়েছে কেবলমাত্র বিশেষাধিকার প্রাপ্ত কিছু ব্যক্তির। ফলে, তাদের দেয়া আশ্বাসবাণীর কতটা ঠিক, সেটা বিচার করার ক্ষমতা নেই আমার বা আপনার।

এই পরিস্থিতিতে, ভারত সরকার বর্তমান IT আইনে কিছু পরিবর্তন করে, সোশ্যাল মিডিয়াকে, তাদের মাধ্যমে প্রচারিত তথ্যের বিষয়ে দায়িত্বশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে। এটা অস্বীকার করার কোন যায়গা নেই যে আজ থেকে ১৫ বছর আগে চলা অর্কুট বা ইয়াহু মেসেঞ্জার ছিল মূলত ব্যক্তিগত আলাপচারিতার মাধ্যম। এমনকি প্রাথমিক অবস্থায় ফেসবুক বা হোয়াটসঅ্যাপের ব্যবহারও ছিল প্রধানত ব্যক্তিগত সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু বর্তমানে হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রচারের এবং তার মাধ্যমে স্বার্থসিদ্ধির অন্যতম হাতিয়ার। দেশের বিভিন্ন যায়গায় গণপিটুনির ফলে যেসব মৃত্যু ঘটেছে সেগুলি ঘটানোর পিছনে ব্যবহৃত হয়েছে হোয়াটসঅ্যাপের মত অ্যাপ। তাই, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আইনের পরিবর্তনটাও জরুরী আর সেটা মাথায় রেখেই, পরিবর্তিত আইনে, সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রচারিত কোন বার্তার, যা দেশের একতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বিপজ্জনক হতে পারে, দায় নিতে হবে সেই মিডিয়াকেও। প্রয়োজনে প্রশাসনকে জানাতে হবে যে সেই বার্তার উৎস কোথা থেকে হয়েছে। আর সেই কাজ করার জন্যেই কোম্পানিগুলোকে বলা হয়েছে একজন কমপ্লায়েন্স অফিসার (যিনি দেখবেন যে আইন ঠিকমত অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা), একজন নোডাল অফিসার (যিনি প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রাখবেন) এবং একজন অভিযোগ সুরাহার অফিসার বা Grievance Redressal Officer (যার কাছে অভিযোগ জানানো যাবে) আর এদের তিনজনেরই ভারতের কোন ঠিকানা দিতে হবে যাতে অনির্দিষ্টকালের জন্যে উত্তরের অপেক্ষায় বসে না থাকতে হয়। আর একইসাথে, প্রতি মাসে, অভিযোগ প্রাপ্তি ও সেগুলির সুরাহার বিষয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করতে হবে।

এখানেই বড় কোম্পানিগুলোর ব্যথা হচ্ছে যে এতদিন তারা, encryption ও ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তার বাহানায় যে দায়িত্ব এড়িয়ে যেত এবার থেকে সেগুলির দায় তাদের নিতে হবে। গ্রাহকদের বিভিন্ন তথ্য, এমনকি তাদের বিনা অনুমতিতে নেয়া তথ্য বেচেও তারা যে বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করতো অথচ সেগুলির দায় তাদের ছিলনা, এবার সেই পরিস্থিতি বদলাতে যাচ্ছে। আপনার তথ্যের বিনা অনুমতিতে ব্যবহার কিভাবে হয় সেটা খুব সহজে বুঝতে ফ্লিপকার্ট বা অ্যামাজনে যেকোন একটা জিনিস নিয়ে একটু ঘাঁটাঘাঁটি করুন আর তারপর ফেসবুক খুলুন, দেখবেন সেই প্রোডাক্টের বিজ্ঞাপন আপনার টাইমলাইনে ভেসে উঠবে। অফ-ফেসবুক অ্যাক্টিভিটির মাধ্যমে ক্রমাগত এই গোয়েন্দাগিরি চালিয়েই যাচ্ছে বিভিন্ন অ্যাপ। এমনকি অ্যালেক্সা বা গুগল ডট-এর মত স্বর চালিত (voice driven) প্রযুক্তির যন্ত্রগুলি, আপনার অনুমতি ছাড়াই রেকর্ড করে নিচ্ছে আপনার পরিবারের আভ্যন্তরীণ আলোচনা।

এমতাবস্থায়, আমি ভারত সরকারের নতুন আইনকে অবশ্যই সমর্থন করি। ডিজিটাল দুনিয়া থেকে আজকে আর বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় কিন্তু সেখানে যখন থাকতেই হবে তখন সেই দুনিয়ার দ্বারপাল হিসাবে, সিলিকন ভ্যালির কোন অজ্ঞাত সার্ভারের বদলে আমি আমার নির্বাচিত সরকার ও প্রশাসনের উপরেই বেশী ভরসা রাখবো।