Wednesday, October 20, 2021

মোদী ও মমতা

পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর থেকেই কংগ্রেসকে দুর্বল করার জন্যে নরেন্দ্র মোদীর অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠেছেন মমতা ব্যানার্জী। এই কারণেই গোয়া বা আসামের কংগ্রেসের বিক্ষুব্ধরা, আম আদমি পার্টির মত হিন্দি বলয়ের পার্টির বদলে, তৃণমূল কংগ্রেসের মত একটা আঞ্চলিক দলে যোগদান করছে। মমতার হাতে বিপুল সংখ্যক বিধায়ক থাকায়, বিক্ষুব্ধদের প্রলুব্ধ করার জন্যে, রাজ্যসভার আসন তো আছেই। এইভাবে, জাতীয় রাজনীতিতে, রাহুল গান্ধীর বদলে নম্বর দুই হতে চাইছেন মমতা ব্যানার্জী।


২০২৪-এর নির্বাচনে মোদীকে লড়তে হবে বিপুল পরিমাণ প্রতিষ্ঠান (anti-incumbency) বিরোধিতার সাথে সাথে হিন্দুত্ববাদীদের একটা বড় অংশের বিরুদ্ধে। 'সবকা বিশ্বাস' অর্জন করতে গিয়ে 'হিন্দু হৃদয় সম্রাটে'র আসন এখন টলোমলো। এরসাথে যুক্ত হয়েছে দলের প্রমুখদের সীমাহীন ঔদ্ধত্য আর বানিয়া নীতি। এমতাবস্থায় কংগ্রেস যদি, নিজেদের বর্তমান ৪৫ সাংসদ সংখ্যাকে একশো'র উপরে নিয়ে যায় তাহলে বাড়তি আসনগুলি সরাসরি প্রভাবিত করবে বিজেপিকে আর সেক্ষেত্রে বিজেপি সংসদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে বাধ্য। এই কারণেই মোদী কংগ্রেসের আসন কমাতে বদ্ধপরিকর আর সেক্ষেত্রে তার সেরা বাজী অবশ্যই মমতা।


এটা মমতা'র জন্যে সম্পূর্ণ win-win পরিবেশ। তিনি নিজে চরম উচ্চাকাঙ্খী হলেও এটা বোঝেন যে জাতীয় স্তরে মোদীর বিকল্প হওয়ার মত যোগ্যতা তার এখনও নেই। তাই আপাতত তিনি ২ নম্বর আসন পেলেই খুশী থাকবেন আর চোখ রাখবেন ১৯৯৬ এর মত পরিস্থিতি তৈরী হয় কিনা যেখানে ডামাডোলের বাজারে, দেবেগৌড়া বা গুজরালের মত, তিনি প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেয়ে যান। কে বলতে পারে যে তুমুল জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও বাজপেয়ী সরকার যেভাবে সোনিয়ার কংগ্রেসের কাছে পরাজিত হয়েছিল, শাইনিং ইন্ডিয়া বা ফিল গুড-এর মৌতাতে থেকে 'বিকাশ পুরুষ' বা 'লৌহ পুরুষে'র যে পরিণতি হয়েছিল, ২০২৪ এ সেটার পুনরাবৃত্তি হবেনা? এটা মাথায় রেখেই মোদী এখন মমতা'কে জাতীয় রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় রেখে যাবেন আর মমতাও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে যাবেন। হ্যাঁ, এতে বঙ্গ বিজেপি রসাতলে যাবে ঠিকই তবে আরিয়ান খানের আব্বার কি একটা ডায়লগ আছে না, "কুছ পানে কে লিয়ে কুছ খোনা পড়তা হ্যায়" আর বঙ্গ বিজেপির নেতৃত্ব ও কার্যকলাপ দেখার পরে, এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে তাদের বলি দিতে মোদীর কোন কুন্ঠা হবেনা।

Monday, October 18, 2021

বাঙালী

বিজেপি'র দলদাসরা বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতন নিয়ে মোদী বা ভাগবতের মৌনতাকে যথার্থ প্রমাণ করার চেষ্টা করবে এই বলে যে পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। যদিও কয়েকদিন আগে তাদের নেতারাই গর্ব করে বলছিলেন যে তারা আড়াই কোটি হিন্দুর ভোট পেয়েছেন আর মমতা জিতেছে মুসলমানদের ভোটে। এরপরেও বাংলাদেশের সাথে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের সম্পর্ক কি সেটা শ্রী রামই জানেন। বিজয়া দশমীর শোভাযাত্রায় অনুরাগ পোদ্দারকে বিহার পুলিশ গুলি করে খুন করলে এরা অন্যায় দেখেনা কারণ সেখানে সরকার তাদের দলের সহযোগী। আসলে 'সহী হিন্দু' হওয়ার বাসনায়, তাদের মধ্যে বাঙালী বিদ্বেষ এতটাই ঢুকে গেছে যে কোন বাঙালী সেলিব্রিটি জাতীয় স্বার্থ বিরোধী কোন মন্তব্য করলে তারা গোটা জাতিকেই 'দেশদ্রোহী' তকমা দিয়ে দেয় কিন্তু গান্ধীর মত বিকৃতকাম দেশদ্রোহীর জন্ম দেয়ার পরেও গুজরাটিরা তাদের কাছে দেশপ্রেমী। আসলে এরা জানে যে নিজেদের পেট চালানোর জন্যে, টাকার যোগান বজায় রাখতে হলে কাকে তেল দিতে হবে। তাই এই সরলীকরণ। 


উল্টোদিকে তৃণমূলের দলদাসরা। তাদের না আছে কোন আদর্শগত ভিত্তি আর না আছে কোন দূরদর্শিতা। দলের চালিকাশক্তি একটা পরিবারের হস্তগত আর বাকি সব নেতার মানসিকতাই হলো কামিয়ে নেয়া। তাই ওপার বাংলা থেকে লাথি খেয়ে আসা ক্যাডাররাও, মমতা ব্যানার্জীর "দুধেল গাই"-এর তত্ত্ব শুনে ঘাড় কাত করে, নাহলে ধান্ধা বন্ধ হয়ে যাবে যে। আর দেশের বৃহত্তম বাঙালী রাজ্যের প্রধান হয়েও, প্রতিবেশী দেশে বাঙালীদের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ নিয়ে মমতা ব্যানার্জী নীরব থাকেন। যদিও রাজ্য থেকে কয়েকশো কিলোমিটার দূরে, আখলাখ বা আফরাজুলদের হত্যা হলে সেই মমতা ব্যানার্জীই সোচ্চার হয়ে ওঠেন কিন্তু বাঙালী হত্যা নিয়ে, এখনও অবধি, তিনি টুঁশব্দ করেননি কারণ দুর্গা পূজার নামে ক্লাবে ৫০,০০০ টাকা দিলেই তার দায়িত্ব শেষ। বাংলাদেশ থেকে কয়েক টন ইলিশ এনে দিলেই তার জয়ধ্বনি উঠবে। তিনি বুঝে গেছেন যে মেরুদন্ডহীন বাঙালীর বিবেকের মূল্য মাত্র মাসে ৫০০ টাকা।


কিন্তু এই দুই-এর বাইরেও বাঙালী আছে যাদের মেরুদণ্ড এখনও বিক্রিত বা বিকৃত হয়নি। তাদের কাছে বাঙালীত্ব আর হিন্দুত্ব পরিপূরক। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্যে, কোন রাজনৈতিক মতাদর্শের কাছে মাথা বিকিয়ে দেয়নি। বাঙালী আক্রান্ত হলে তারা সোচ্চার হবেই সেটা কোন রাজনৈতিক দাদা বা দিদির অনুমতি থাকুক বা নাই থাকুক। হ্যাঁ, তারাই বাংলার ভবিষ্যৎ রক্ষা করবে। 'জয় মা কালী' তাদের মন্ত্র, তাদের প্রেরণা।

Friday, October 15, 2021

অসি বনাম মসি

অশুভকে ধ্বংসের প্রতীক মা দুর্গার পুজোকে বাঙালী 'শারোদৎসব' বানাবে, আরাধনার সময় মা'কে অস্ত্রহীন করে অসহায় মহিলার প্রতীক বানাবে, যবনদের দোকান থেকে হালাল মাংস কিনে, সেটা কবজি ডুবিয়ে খেলেও বলি প্রথা নিয়ে আপত্তি করবে, সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে পূজামণ্ডপে আযানের সময়সূচি টানাবে আর তারপরেও আশা করবে যে বাকি সবাই যেন তাদের 'মেধা'কে সম্মান করে। বিগত কয়েক দশক ধরে, শৌর্য ও সাহসিকতার মত গুণাবলীকে, তথাকথিত, বৌদ্ধিক ক্ষমতার থেকে হীন দৃষ্টিতে দেখা বাঙালীর পতনের অন্যতম কারণ।


ঘটনা কতটা সত্যি সেটা বোঝা যায় আমাদের ক্ষুদিরাম বা নেতাজী প্রীতির বদলে গান্ধীভক্তি দেখে। সংঘাতের বদলে আপোষকেই আমরা আমাদের মূলমন্ত্র হিসাবে মেনে নিয়েছি। তাই ক্ষুদিরাম এখন বাঙালীর কাছে "বাড় খাওয়া" র প্রতীক। আর এই স্বভাব কিন্তু একদিনে হয়নি, হয়েছে বছরের পর বছর আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ভ্রান্ত শিক্ষার ফলশ্রুতিতে। বর্তমান প্রজন্মে এই মানসিকতার জন্যে, তার পূর্ববর্তী প্রজন্ম অর্থাৎ তাদের পরিবারও সমানভাবে দায়ী। আর তার সঙ্গে দায়ী আমাদের ধর্মগুরুরা যারা সমাজকে ধর্মের শিক্ষা অর্থাৎ সামাজিক কর্তব্য পালনের শিক্ষা দেয়ার বদলে, তাঁদের শিষ্যদেরকে কেবলমাত্র আত্মবিকাশ ও আত্মপ্রচারের পথে চালিত করেছেন।


এরই ফলস্বরূপ বাঙালী, বিশেষত, তাদের যুবসমাজ এমন এক ট্যাঁশ প্রজাতিতে পরিণত হয়েছে যাদের সামনে সমাজের জন্যে কাজ করার কোন পরিকল্পনা নেই, পিছনে কোন অনুপ্রেরণা নেই। ফলে শিঁকড় বিহীন, বিবেক শূন্য এই যুবসম্প্রদায় স্রোতের জলে কচুরিপানার মত ভেসে চলেছে লক্ষ্যহীন ভাবে। পুঁথিগত শিক্ষার ফলে তাঁদের মধ্যে বিদ্যা তো আসছে কিন্তু অভাব দেখা দিচ্ছে শিক্ষার। যে শিক্ষা তার পাওয়া উচিত ছিল তার পরিবার থেকে, শিক্ষকদের থেকে, ধর্মীয় গুরুদের থেকে। শিক্ষার অভাবের ফলে তাদের জীবন শুধু বর্তমান কেন্দ্রিক হয়ে গেছে।


অথচ অন্যান্য ধর্মসম্প্রদায়ের মধ্যে এই অসুবিধা নেই। তাদের পরিবার, সমাজ, ধর্মগুরুরা আজও তাদের কারবালার কথা বলে অনুপ্রাণিত করেন, গ্বাজা এ হিন্দের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের ভবিষ্যতের লক্ষ্য স্থির করে দেন। ফলে নিজেদের শিঁকড়ের সাথে তাদের যোগসূত্র প্রতিদিন আরও দৃঢ় হয়। আর তাদের এই দৃঢ়তার সামনে হীনমন্যতায় ভোগে বাঙালী যুবসমাজ। তাই তাদেরই অনুকরণ করে, অনুসরণ করে, নিজেদের সীমাবদ্ধতা লুকাতে চায়। আর কচুরিপানার পক্ষে সেটা খুব অস্বাভাবিক নয়।


হালাল খাদ্যে সম্মতি দেয়া, বিদ্যালয়ে সরস্বতী পূজার সঙ্গে নবী দিবস পালনে সম্মত হওয়া, মসজিদের সামনে দিয়ে শবদেহ নিয়ে যাওয়ার সময় হরিধ্বনি না দেয়া, এই সবই আপোষের পরিচায়ক। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী যে আপোষের দ্বারা কোন জাতি নিজের পরিচয় ও অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারেনি। সেটাই যদি পারতো তাহলে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের পরেও, হিন্দুবহুল ভারতে কাশ্মীর বা কালিয়াচক বা আজাদ ময়দান ঘটতো না, ভারতের মাটিতে "ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে, ইনশাল্লাহ ইনশাল্লাহ" বা "আফজল হাম শরমিন্দা হ্যায়, তেরে কাতিল জিন্দা হ্যায়" স্লোগান উঠতো না।


আপোষ করে পরিচয় ও ধর্ম রক্ষা করা যায়না। মহাভারতের সময়ে, কৌরবদের থেকে মাত্র পাঁচটা গ্রামের দাবী হোক বা বর্তমান সময়ে বিদ্যালয়ে চিরাচরিত সরস্বতী পূজার দাবী - আবেদন নিবেদনের দ্বারা কখনই অধিকার প্রতিষ্ঠা করা যায়না। অধিকার কোন ভিক্ষা নয় যা চাইলে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, অধিকার হল দাবী যা দাবীদারের মধ্যে ছিনিয়ে নেয়ার শক্তি থাকা দরকার। যারা বলেন যে অসির চেয়ে মসির ক্ষমতা বেশী, আমি তাদেরকে শুধু এটাই মনে করিয়ে দিতে চাই যে মসি তখনই অসির চেয়ে শক্তিশালী যখন সেই মসির সুরক্ষায় একটা অসি নিযুক্ত থাকে।

Thursday, October 14, 2021

কুমিল্লার ঘটনা

কুমিল্লা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে কাঁদুনি গাইতে পারেন, অ্যাংরি রিঅ্যাক্ট করতে পারেন, বুদ্ধিজীবীদের একদেশদর্শীতার জন্যে গালাগাল দিতে পারেন, লম্বা লম্বা থিওরি নামাতে পারেন বা এই সুযোগে নিজের দলের প্রচারটাও সেরে নিতে পারেন কিন্তু এর কোনটাতেই আরেকটা কুমিল্লা হওয়া বন্ধ হবেনা। 


ব্রাহ্মণবেড়িয়া, নাসিরনগর, কুমিল্লা ইত্যাদি হতেই থাকবে কারণ গত কয়েকশো বছর ধরে, খুব সুপরিকল্পিতভাবে, হিন্দুদের নিবীর্যকরণের পরিকল্পনা চলছে, শক্তিহীন করে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে আর দুর্বল কেবলমাত্র বিলাপই করতে পারে, প্রতিশোধ নিতে পারেনা। তাই বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের, মূলত হিন্দুদের, উপর ক্রমাগত অত্যাচার হওয়া সত্ত্বেও কোন সংখ্যালঘু সংগঠন মানববোমার কথা ভাবেনা, ঈদের জমায়েতে বাস চালিয়ে দেয়ার কথা ভাবেনা। তারা খালি প্রত্যাশায় থাকে যে ভারত তাদের বাঁচাবে, আমেরিকা তাদের বাঁচাবে। তাদের অবচেতন মনে 'মিলেমিশে থাকার' মানসিকতার শিকড় এখনও এমন গভীরভাবে ঢুকে গেছে যে প্রিয়া সাহা'র মত কেউ হিন্দুদের উপর হওয়া নিয়মিত অত্যাচার নিয়ে সোচ্চার হলে, তার বিরুদ্ধেই ফতোয়া জারি করে।


বাংলাদেশের বহু হিন্দুই পশ্চিমবঙ্গ সহ ভারতের এলাকায় জমি কিনে রেখেছে যাতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হলে পালিয়ে আসতে পারে কিন্তু মজার কথা হলো যে পালিয়ে আসার পরেও, তারা কখনই স্বীকার করবেনা যে তারা তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হওয়া অত্যাচারের প্রেক্ষিতে পালিয়ে এসেছে। কেউ অজুহাত দেবে মা'য়ের চিকিৎসার, কেউ ছেলের উচ্চশিক্ষার বা কেউ মেয়ের বিয়ের। বরং নিজেদের সেকুলার প্রমাণ করার জন্যে, মোদী কেন CAB বা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে, প্রতিবেশী দেশ থেকে আগত লোকেদের ধর্মীয় পরিচয়কে নাগরিকত্ব দেয়ার মাপকাঠি বানিয়েছেন, সেটা নিয়ে লেকচার দেবে।


বাংলাদেশের হিন্দুরা যতদিন পর্যন্ত না তাদের এই দ্বিচারিতা থেকে মুক্তি পাবে ততদিন তারা অত্যাচারের শিকার হতেই থাকবে। কিল খেয়ে কিল হজম করা ব্যক্তিদের কেউ রক্ষা করতে পারেনা। লাখখানেক রোহিঙ্গা যদি গোটা পৃথিবীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারে তাহলে বাংলাদেশের এক কোটি হিন্দু সেটা পারবেনা, এই কথা আমি বিশ্বাস করিনা। কিন্তু অন্যের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে তাদের নিজেদের ঠকানোর প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের এক কোটি হিন্দু যদি, একযোগে, তাদের উপর হওয়া অত্যাচার নিয়ে সোচ্চার হয় এবং ভারতে আশ্রয় চায় তাহলে গ্যারান্টি দিতে পারি যে ভারত সহ গোটা পৃথিবী তাদের পাশে দাঁড়াবে। এবার সিদ্ধান্ত তাদের যে তারা সোশ্যাল মিডিয়ার আন্দোলনেই খুশী, কালো রঙের ডিপিতেই খুশী নাকি চিরস্থায়ী সমাধান চান।

Sunday, September 26, 2021

সম্প্রীতির মূল্য

তেলেঙ্গানা রাজ্যের অষ্টম শ্রেণীর সোশ্যাল সাইন্সের বইয়ের একটা ছবি নিয়ে শোরগোল শুরু হয়ে গেছে। ছবিটাতে একজন মুসলমান সন্ত্রাসবাদীকে কোরান আর অন্য হাতে রকেট লঞ্চার নিয়ে দেখা যাচ্ছে বলে ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো নাকি বিপন্ন। এই বইয়ের প্রকাশকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্যে রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রীর কাছেও দরবার করেছে স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশনের (SIO) সদস্যরা মানে যাদের একহাতে কোরান আর অন্য হাতে কম্পিউটার আছে। SIO-এর সভাপতি, ডঃ ফৈয়াজুদ্দিনের মতে এই ছবি নাকি বিদ্যার্থীদের মনকে দূষিত করবে আর তাদের মধ্যে ইসলামভীতির জন্ম দেবে। এতে নাকি সমাজের সম্প্রীতি, ঐক্য আর সংহতিও বিপন্ন হবে।

সত্যিই তো, একজন মুসলমান সন্ত্রাসবাদী একহাতে কোরান আর অন্য হাতে রকেট লঞ্চার নিতেই পারে, আজাদ ময়দানে অমর জওয়ান জ্যোতি স্তম্ভে লাথি মারতেই পারে, ইয়াকুব মেমনের জানাজায় লক্ষাধিক মুসলিম শোক পালন করতেই পারে, আফজাল গুরুর ফাঁসির জন্যে লজ্জাবোধ করতেই পারে, আল্লাহ-হু-আকবর বলে ভীড়ের মধ্যে বাস চালিয়ে দিতেই পারে, স্কুলে মিলাদ উল নবী পালিত না হলে সরস্বতী পূজা হতে না দেয়ার দাবী করতেই পারে, গ্বাজা-এ-হিন্দের স্বপ্ন দেখতেই পারে কিন্তু তাই বলে বালক বিদ্যার্থীদের মনে ইসলামভীতি তৈরী করা কখনই উচিত নয় আর সেই জন্যেই তো জ্যোতি বসুর সরকার একদম সার্কুলার জারি করে বলে দিয়েছিল যে ইসলামিক শাসকদের দ্বারা মন্দির ভাঙার কোন তথ্য ইতিহাস বইতে দেয়া যাবেনা।

এই মূর্খ প্রকাশক যে ভুল করেছে তারজন্যে কাল যদি কেউ তার কল্লা নামিয়ে দেয় তাহলে কিন্তু ভুল বুঝবেন না। সমাজে সম্প্রীতি ও ঐক্য বজায় রাখার জন্যে এই দায়িত্ব তো কাউকে নিতেই হবে, তাই না?


https://www.news18.com/news/india/telangana-govt-urged-to-delete-islamophobic-content-showing-terrorist-with-quran-from-school-textbook-4247354.html

Tuesday, August 24, 2021

শরণার্থীর আড়ালে

আয়লান কুর্দির কথা মনে আছে? হ্যাঁ, সেই বাচ্চাটার কথাই বলছি সাগরপাড়ে যার মৃতদেহ দেখিয়ে, ইউরোপবাসীদের উপর মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল সিরিয়ার মুসলিম শরণার্থীদের জন্যে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দরজা খুলে দেয়ার জন্যে। জার্মানিও খুলে দিয়েছিল নিজেদের সীমান্ত আর স্রোতের মত ঢুকেছিল শরণার্থীরা এবং পরিণতিতে, তাদের ধর্মানুভুতি আহত হচ্ছে বলে, জার্মানির বহু যায়গাতেই মহিলাদের বিকিনি পরার প্রতিবাদ করেছিল তারা। ছেলের মৃতদেহের সুবাদে বিখ্যাত ও লন্ডনে আশ্রয় পাওয়া আয়লানের বাবা আবেদন জানিয়েছিল যাতে অন্যান্য দেশগুলো শরণার্থীদের প্রতি আরও সহৃদয় হয়।


এরপর আসলো রোহিঙ্গা মুসলমান। মায়নমারে তাদের মানবাধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার গল্প আর তাদের দেশত্যাগের ছবি ছড়িয়ে পড়লো বিশ্বজুড়ে। ডিঙি নৌকায় তাদের অস্ট্রেলিয়া পাড়ি দেয়ার আর নৌকাডুবির গল্প শুনে শিউরে উঠলাম আমরা। কোন জাদুবলে তারা ভারতে সীমান্ত নিরাপত্তাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে, পৌছে গেল দিল্লী, হরিয়ানা, কাশ্মীর অবধি। এরপর, কেন্দ্র সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক যখন নোটিশ জারি করে, তাদেরকে দেশের নিরাপত্তার প্রতি বিপজ্জনক বললো, তাদের রক্ষায় এগিয়ে আসলো দেশের সর্বোচ্চ আদালত। দেশের রাজধানীতে, জনগণের ট্যাক্সের টাকায়, বিশাল বিশাল বাংলোর অধিবাসী আদালতের মহামান্য বিচারপতিরা রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশকারীদের নিরাপত্তা ও মানবাধিকার নিয়ে লম্বা আদেশ দিলেও তাদের একজনও কিন্তু নিজেদের বাংলোর অব্যবহৃত যায়গায় একটা রোহিঙ্গা পরিবারকেও বসাতে আগ্রহী হলেন না। ঝাড়ের বাঁশকে সেধে গাঁ* কে বা নিতে চায়!


এখন আবার এসেছে তালিবান উপদ্রুত অঞ্চলের শরণার্থীদের ঢল। কাবুল এয়ারপোর্ট আর বিমান থেকে পড়ে যাওয়ার ছবি দেখিয়ে জমি ইতিমধ্যেই তৈরী আর প্রতিবেশী দেশগুলিকে, আফগান শরণার্থীদের নেয়ার জন্যে সীমান্ত খুলে দেয়ার আহ্বান জানিয়ে, বীজ ফেলার কাজও শুরু করে দিয়েছে রাষ্ট্রসঙ্ঘের উদ্বাস্তু বিষয়ক হাইকমিশনার। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে আফগানিস্তান এখন হিন্দু শূন্য।


কখনও সিরিয়ান, কখনও রোহিঙ্গা আর কখনও আফগানদের দেখিয়ে এই খেলা চলতেই থাকবে। উদ্বৃত্ত জনসংখ্যা দ্বারা, অন্যের জমি দখল করার এই পরিকল্পনা সম্পূর্ণ ধর্মীয়। পবিত্র গ্রন্থ অনুসারে, এই পদ্ধতির নাম হিজরাত। শরণার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় খেয়াল করে দেখুন, অঙ্কটা অনেক সহজ হয়ে যাবে। আর তারপরেও যদি আপনি মানবাধিকারের ভেক ধরতে চান তাহলে অভিনন্দন, আপনি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে সুন্নত আর হিজাব সুনিশ্চিত করে ফেলেছেন।

Saturday, August 21, 2021

কল্যাণ সিং

ইংরেজিতে একটা কথা আছে, unsung hero, এটার বাংলা কি জানিনা তবে অখ্যাত নায়ক বলা যেতে পারে। রাম জন্মভূমি আন্দোলনের সেই unsung hero হলেন কল্যাণ সিং। মন্দির আন্দোলনে আদবানী, উমা ভারতী, বিনয় কাটিয়ার, এমনকি সাধ্বী ঋতম্ভরাও এক সময় যতটা প্রচার পেয়েছিলেন তার কণামাত্র পাননি কল্যাণ সিং অথচ ভারতের স্বাভিমানের উপর কলঙ্কচিহ্ন হয়ে থাকা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের জন্যে তিনি নিজের সরকারকে বিসর্জন দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি।


কংগ্রেসের সমর্থনে, কেন্দ্রে যখন দেবেগৌড়ার সরকার গঠিত হয় তখন রাজ্যপাল রমেশ ভান্ডারীকে ঘুটি বানিয়ে, বরখাস্ত হয় গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত কল্যাণ সিং-এর সরকার এবং বসানো হয় জগদম্বিকা পাল নামের এক পুতুলকে। তিন রাত্রি ক্ষমতায় থাকাকালীন জগদম্বিকা কত লক্ষ টাকার ফোনের বিল তোলেন সেটা, সেই সময় যারা রাজনৈতিক খবরাখবর রাখতেন, তাদের মনে আছে। যদিও প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমান প্রতিরক্ষামন্ত্রী, রাজনাথ সিং, কল্যাণ সিং-এর মন্ত্রীসভাতেই শিক্ষামন্ত্রী হিসাবে প্রথম প্রচারের আলোয় আসেন কিন্তু রাজনাথের 'কড়ি নিন্দা'র সংস্কৃতি কল্যাণ সিং-এর ছিলনা। তাই তিনি রাজ্যপালের অসাংবিধানিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে যান এবং দেশের ইতিহাসে প্রথমবার, এবং এখনও অবধি সম্ভবত একবারই, বিধানসভাতে দুইজন মুখ্যমন্ত্রীর যুগপৎ আস্থাভোট নেয়া হয়। সেই ভোটে জগদম্বিকা পালকে হারিয়ে এবং কংগ্রেসের মুখে চুনকালি মাখিয়ে জয়ী হন কল্যাণ সিং। 


কল্যাণ সিং নিজে সমাজের পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠী থেকে রাজনীতির পাদপ্রদীপের আলোয় আসলেও না নিজের শিকড়কে কখনও ভুলেছেন আর না রাজনৈতিক স্বার্থে সেটার কখনও অপব্যবহার করেছেন। জাতপাতের রাজনীতিতে খন্ডিত উত্তর প্রদেশকে তিনি হিন্দুত্বের সুতোয় বাঁধার চেষ্টা করেছিলেন। তার মৃত্যু, নিঃসন্দেহে, দেশের রাজনীতিতে এক শূন্যতার সৃষ্টি করবে। ওম শান্তি!

Monday, August 16, 2021

গোপাল পাঁঠা এবং

মহম্মদ আলি জিন্নাহর ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে'র আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে, ১৯৪৬ সালের ১৬ই আগস্ট সংগঠিত গ্রেট ক্যালকাটা কিলিং-এর রিপোর্ট করতে গিয়ে তদানীন্তন ব্রিটিশ সরকারের একটি মিলিটারি রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, The trouble started early on the morning of the 16th and both sites were equally responsible. The Hindus started putting up barricades at Tala Bridge and Belgachia Bridge and other places to prevent Muslims processions coming into the town and Muslims goondas went round forcing Hindus to close their shops। মানে, দাঙ্গার জন্যে নাকি হিন্দু-মুসলমান, উভয়েই দায়ী ছিল। এরকম সিদ্ধান্তের কারণ হলো মুসলমান গুন্ডারা যখন হিন্দুদের দোকান বন্ধ করতে করতে এগিয়ে আসছিল তখন তাদের প্রতিহত করার জন্যে টাল ব্রিজ, বেলগাছিয়া ব্রিজ সহ অন্যান্য স্থানে হিন্দুরা প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। 


মানে, সম্প্রীতি রক্ষার স্বার্থে, হিন্দুদের উচিত ছিল বিনা প্রতিরোধে, জেহাদিদের কাছে নিজেদের যথাসর্বস্ব সঁপে দেয়া। এই দাঙ্গার দুই মাস পরে, নোয়াখালীতে যখন হিন্দুদের উপর জেহাদিরা আক্রমণ করেছিল তখনও বানিয়া গান্ধী বলেছিল যে "হিন্দু রমণীদের দাঁতে দাঁত চেপে ধর্ষণের জ্বালা সহ্য করা উচিত"। এই কথাগুলো খুব চেনা চেনা লাগছে কি? আজ্ঞে হ্যাঁ, এই তত্ত্ব মেনেই, আজও পুলিশকে লাথি মারার পরেও বাড়িতে রেশন পৌছে যায় আর তেলেনিপাড়ার ঘটনায়, স্থানীয় পুলিশ কর্তা, হুমায়ুন কবীরের অপদার্থতা প্রকাশ করার জন্যে আমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এই সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্যেই মহরমের জন্যে দুর্গাপূজার বিসর্জন স্থগিত হয়ে যায়। সম্প্রীতির স্বার্থেই রবি, রুদ্রেশ, কমলেশ তিওয়ারিরা খুন হয়ে যায় কিন্তু NIA-এর দাবী মেনে PFI কে নিষিদ্ধ করা হয়না। সম্প্রীতির কারণেই জমজমের পানি আনার জন্যে বিমানের নিরাপত্তা বিধি বদলানো হয় আর কুম্ভমেলার সময় ভারতীয় রেল টিকিটের উপর অতিরিক্ত সারচার্জ নেয়।


সৌভাগ্যক্রমে, গোপাল পাঁঠা বানিয়া ছিলেননা আর স্বজাতির আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে, সেকুলার সাজার দায়ও তাঁর ছিলনা। তাই বানিয়া গান্ধী তাঁকে অস্ত্র সমর্পণের কথা বললে, মা কালীর ভক্ত বঙ্গসন্তান সেটা প্রত্যাখ্যান করতে পারেন। পাঁঠা কাটার অস্ত্র তিনি অনায়াসে স্বজাতিকে রক্ষা করতে পারেন। হ্যাঁ, এটাই বাঙালীর বিশেষত্ব, তারা যেমন বুক দিয়ে আগলে রাখতে পারে, প্রয়োজন হলে বুকে চেপে বসে দাড়ি উপড়ে ফেলতেও পারে। যে কাঠায় মাপ, সে কাঠায় শোধ দেয়ার মানসিকতা বাঙালীর রক্তে রয়েছে। 

জয় মা কালী।

Sunday, August 8, 2021

ছবি আর বাস্তবতা

রাজনীতিতে দেখনদারির মূল্য অসীম। সেখানে, কেউ কি করছে সেটা বড় নয়, কিভাবে সেটা দেখাচ্ছে, সেটাই প্রধান। ইংরেজিতে এটাকে বলে optics বা ছবি। কোন দলের রাজনৈতিক IT cell এর কাজই হলো এরকম optics তৈরী করা। এই optics এর উপর ভিত্তি করেই, সেটার target people মানে যাদের উদ্দেশ্যে সেটা তৈরী করা হয়েছে, তারা খুশী হয়ে যায় আর দলকে সমর্থন দেয়।


এমনই একটা ছবি গত কয়েকদিন ধরে social media তে দেখা যাচ্ছে যেখানে কাশ্মীরের লালচকে, যেখানে ২০১১ সালে পাকিস্তানের পতাকা দেখা গিয়েছিল সেখানে আজ তিরঙ্গা শোভা পাচ্ছে। দৃশ্যটা নিঃসন্দেহে সব ভারতীয়র কাছেই অত্যন্ত আবেগপূর্ণ এবং গৌরবের কিন্তু ছবি দেখে এটা কতজন বুঝতে পারছেন যে ২০১১ সালের ঘটনার সময় লালচক ছিল স্থানীয় অধিবাসীদের দ্বারা পরিপূর্ণ আর ২০২১ এ ত্রিবর্ণরঞ্জিত লালচকে কেবল বিশেষ কয়েকজনই উপস্থিত আছেন।


এটাই optics এর মাহাত্ম্য। ছবি দেখে আপনি ভাববেন যে এককালের উপদ্রুত কাশ্মীর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হয়ে গেছে। এলাকাবাসীর মধ্যে জাতীয়তাবাদের জোয়ার এসেছে কিন্তু বাস্তবে ঘটনা মোটেও তা নয়। জম্মু ও কাশ্মীর থেকে ৩৭০ ধারা উঠেছে ঠিকই কিন্তু তার ফলে না কাশ্মীরবাসীদের মানসিকতায় কোন বদল হয়েছে না সেখানে জাতীয়তাবাদের বিকাশ ঘটেছে। আর সেটা ঘটবেও না যতক্ষণ না পর্যন্ত সেখানে কাশ্মীর থেকে বিতাড়িত হিন্দুদের, উপযুক্ত নিরাপত্তা সমেত পুনর্বাসন দিয়ে, এলাকার জনবিন্যাসের পুনর্গঠন করা হচ্ছে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে যে ভারতের যে এলাকাতেই হিন্দুরা সংখ্যালঘু হয়েছে সেই এলাকাগুলিই হয় বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্বর্গরাজ্য হয়েছে অথবা দেশ থেকে আলাদা হয়ে গেছে অথচ তারপরেও আমরা শুধু একটা ছবি দেখেই নিজেদের সান্ত্বনা দেই যে all is well in Kashmir। 


এই প্রসঙ্গে মনে করিয়ে দেয়া যায় যে ১৯৯২ সালের ২৬শে জানুয়ারী, একতা যাত্রার শেষে, বিজেপির তদানীন্তন সভাপতি, মুরলী মনোহর যোশীও লালচকে জাতীয় পতাকা তুলেছিলেন। সেই ছবিও পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল কিন্তু যেটা হয়নি সেটা হলো যে নরসিংহ রাও সরকার কিভাবে মিলিটারি দিয়ে লালচককে ঘিরে, চরম সুরক্ষা বলয়ের মাধ্যমে যোশীজি কে নিয়ে গিয়ে, মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে গোটা প্রক্রিয়াটা সম্পূর্ণ করেছিলেন। সেদিনও আমরা অর্ধসত্য দেখে নিজেদের ভুল বুঝিয়েছিলাম আর আজও সেই কাজই করে চলেছি। কাশ্মীরকে পুনরায় হিন্দু অধ্যুষিত না করতে পারা অবধি যে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান নেই এই সত্য যতদিন পর্যন্ত নিজেরা না উপলব্ধি করতে পারবো, optics আমাদের বিপথে চালিত করতেই থাকবে।

Saturday, July 24, 2021

গুরু পূর্ণিমা

জুড়িয়া চরণ মুদিয়া নয়ন

প্রণমি তোমারে প্রভু,

রহিবে বিবেক সে শুধু আমার

বিকাবো না তারে কভু।


ঈশ্বর আর বিবেক ছাড়া আমার আর কোন গুরু নেই। হ্যাঁ, পথপ্রদর্শক বা অনুপ্রেরণা (অন্যভাবে নেবেন না) অনেক আছে, কিন্তু গুরু নেই। ব্যক্তি গুরুর দোষ-ত্রুটি থাকতে পারে ভেবে, ডক্টরজী যে কারণে গৈরিক ধ্বজকে সঙ্ঘের গুরু হিসাবে নির্বাচিত করেছিলেন, ছোটবেলায় শোনা সেই কথাই হয়তো অবচেতন মনে চিরস্থায়ী প্রভাব ফেলে দিয়েছে।

না, তাই বলে আমি জীবনে গুরুর প্রয়োজনের কথা অস্বীকার করিনা। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হয়তো তাঁর দরকার পড়ে কিন্তু সেক্ষেত্রে একজন নির্দিষ্ট ব্যক্তিকেই সব ক্ষেত্রে গুরু মানতে হবে, এটা মানতে পারিনা। বিশেষত সেই গুরুদের তো একদমই গুরুত্বহীন মনে হয় যারা জীবিত অবস্থায় সম্মুখীন হওয়া বিভিন্ন সমস্যা সম্পর্কে ভক্তদের অবগত না করিয়ে মৃত্যুর পরে কিভাবে মোক্ষলাভ হবে তার উপায় বলেন। ঐহিক জীবনে ধার্মিক কর্তব্য পালনে ব্যর্থ কোন ব্যক্তির পারত্রিক জীবন বৈকুণ্ঠধামে বা শিবলোকে কাটবে বলে আমি বিশ্বাস করিনা।

তাই, ঈশ্বর আর বিবেকই আমার গুরু। ঈশ্বর শক্তি যোগান আর বিবেক সঠিক পথ দেখায়। এই আত্মদীপের আলোতেই যেন সারা জীবন চলতে পারি এটাই মা কালীর কাছে প্রার্থনা। 

সবাইকে গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা।

Wednesday, July 7, 2021

আপনি আচরি ধর্ম

চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য তখন সিংহাসনে বিরাজমান আর তার প্রধানমন্ত্রী হিসাবে আসীন স্বয়ং চাণক্য, গ্রীকদের পরাজিত করে চন্দ্রগুপ্ত তখন চক্রবর্তী সম্রাট, এমন সময়ে ভারতে এলেন গ্রীক পর্যটক, মেগাস্থিনিস। ভারতে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই তিনি রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেরালেন। রাজকর্মচারী থেকে প্রজা- সবার সাথেই কথাবার্তা বললেন। আর সবার সঙ্গে কথাবার্তা বলার তিনি উপলব্ধি করলেন যে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের মূল চালিকাশক্তি হলেন চাণক্য। তাই তিনি চাণক্যর সাথে একদিন দেখা করার জন্যে সময় চাইলেন।

অতিথিকে দেবতা হিসাবে দেখা দেশে, মেগাস্থিনিসের আবেদন মঞ্জুর হতে দেরী হলনা। গ্রীক পর্যটককে জানিয়ে দেয়া হলো যে প্রধানমন্ত্রী কবে আর কখন, নিজ বাসগৃহে, তার সাথে দেখা করবেন। নির্দিষ্ট দিনে, সন্ধ্যার সময়, মেগাস্থিনিস উপস্থিত হলেন চাণক্যর বাড়িতে। তাকে দেখে, চাণক্য একটু অপেক্ষা করতে বলে, রাজসভার কিছু কাজ সেরে, তাকে ডাকলেন। মেগাস্থিনিস চাণক্যকে যথোচিত অভিবাদন করে বললেন যে তিনি চাণক্যর বিষয়ে অনেক কিছু শুনেছেন, তাই তাঁকে কিছু প্রশ্ন করতে চান। তার এই প্রস্তাব শুনে চাণক্য তাকে প্রতিপ্রশ্ন করলেন যে তিনি তার সাথে ব্যক্তিগতভাবে আলাপ করতে চান নাকি রাজ্যের প্রধানমন্ত্রীর সাথে। এই কথা শুনে মেগাস্থিনিস বললেন যে তিনি প্রধানমন্ত্রী নয়, ব্যক্তি চাণক্যর সাথেই কথা বলতে আগ্রহী।

মেগাস্থিনিসের উত্তর শুনে, চাণক্য তাঁর পাশে জ্বলা প্রদীপটা নিভিয়ে দিয়ে, পাশের আরেকটা প্রদীপ জ্বালিয়ে তাকে প্রশ্ন শুরু করতে বললেন। মেগাস্থিনিস বললেন যে, "এটাই আমার প্রথম প্রশ্ন যে আপনি ঐ প্রদীপটা নিভিয়ে, আরেকটা প্রদীপ কেন জ্বালালেন"? তার প্রশ্ন শুনে চাণক্য মৃদু হেসে বললেন যে, "আমি যে প্রদীপটা নিভালাম সেটার তেল খরচ রাজ্যের কোষাগার থেকে আসে। আমি এতক্ষণ রাজকার্য করছিলাম, তাই ঐ প্রদীপ জ্বলছিল। আপনি আমার সাথে ব্যক্তিগত আলাপের আগ্রহ প্রকাশ করলেন। তাই ঐ প্রদীপটা নিভিয়ে, এটা জ্বালালাম কারণ এটার তেল খরচ আমার প্রাপ্ত সাম্মানিক দিয়ে হয়"। এই কথা শুনে মেগাস্থিনিস বললেন যে আমার আর কোন প্রশ্ন নেই। সবাই চাণক্যর কথা কেন বলে সেটা আমি বুঝে গেছি।

ধান ভানতে গিয়ে শিবের গীতটা একটু দীর্ঘ হয়ে গেল কিন্তু ঘটনা হচ্ছে যে মমতা ব্যানার্জী নন্দীগ্রামের ফল নিয়ে যে মামলা করেছেন সেটা তার ব্যক্তিগত বিষয়, মুখ্যমন্ত্রীর বিষয় নয়। তাই এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে এই মামলার খরচ এবং জরিমানা, যদি দেয়া হয় এবং না দিয়ে যদি ফের সুপ্রিম কোর্টে যান সেক্ষেত্রেও যে খরচ সেটা কে বহন করছে, মমতা ব্যানার্জী নিজে নাকি রাজ্যের কোষাগার? 

Monday, June 21, 2021

আমার চোখে পশ্চিমবঙ্গ দিবস

আচ্ছা, ধরুন আমার বাড়িতে চোর ঢুকে, বেশ কিছু জিনিস নিয়ে পালাচ্ছিল। এমন সময় আমি সজাগ হয়ে গেলাম এবং চোরকে তাড়া করলাম। তাড়া খেয়ে পালাবার সময়, আমার সাথে ধাক্কাধাক্কিতে, চোরের ঝোলা থেকে, আমার বাড়ি থেকেই চুরি করা একটা মোবাইল পড়ে গেল আর আমি, চোরকে ধরতে না পারলেও, একটা মোবাইল ফেরত নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। এমতাবস্থায়, আমি কি সেই মোবাইলটা পেয়েছি বলে উল্লসিত হবো নাকি বাকি জিনিস হারানোর জন্যে দুঃখিত হবো এবং সেগুলো পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করবো?

না, পশ্চিমবঙ্গ দিবস নিয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারছিনা কারণ এটাও, আমার কাছে, সেই পড়ে যাওয়া মোবাইলের মতই, আংশিক প্রাপ্তি। আচ্ছা, জেহাদি হাত থেকে ছিনিয়ে আনা নিজেদেরই অংশ নিয়ে যদি রাজ্যের জন্মদিন পালন করতে হয়, তাহলে কি ১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ কে ভারতের জন্মদিন হিসাবে ধরতে হবে? আমাদের দেশের ইতিহাস, কৃষ্টি, সংস্কৃতি ইত্যাদি তাহলে মাত্র সত্তর বছরের? তাহলে তো বলতে হবে যে নেহরু ঠিকই বলেছিলেন যে India is a nation in making। না, নেহরু ঠিক বলেননি, ভারতের জন্ম মোটেই ১৯৪৭ সালে নয়, রাজনৈতিক বিভাজন মোটেই দেশের জন্মদিন নির্ধারণ করেনা।

একইভাবে, বঙ্গমাতার জন্মদিনও মাত্র কয়েক দশকের পুরনো ঘটনা নয়। মা কে খন্ডিত করলেই তার জন্মদিন বদলে যায়না। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ, মাস্টারদার স্মৃতিবিজড়িত চট্টগ্রাম, মাইকেল মধুসূদন দত্তের যশোর প্রভৃতি স্থান বিহীন বঙ্গমাতা আজও খন্ডিতা। তাই, ঋষি বঙ্কিমচন্দ্রের ভাষায়, মা যা ছিলেন আর মা যা হবেন, আমি সেটার স্বপ্ন দেখি, মা যা হয়েছেন, সেটা নিয়ে উল্লসিত হতে পারিনা। তাই আমার কাছে পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টি উল্লাসের নয়, বেদনার স্মৃতি বয়ে আনে। বিজাতীয় আরবী সংস্কৃতির কাছে পরাজয়ের বেদনা, নিজের দেশের ঐতিহ্যবাহী ভূমিখণ্ড হারানোর বেদনা, নিজের মাতৃভূমিকে জেহাদিদের হাতে খন্ডিত হতে দেয়ার বেদনা। আর এই বেদনার উপশম সেদিন হবে যেদিন আমরা মায়ের খন্ডিত অংশ পুনরুদ্ধার করতে পারবো। আমার মা পূর্ব আর পশ্চিমে বিভক্ত নয়, তিনি সম্পূর্ণা।

Saturday, June 19, 2021

কালনেমির লঙ্কাভাগ

জাতীয় সুরক্ষার নামে পশ্চিমবঙ্গের বিভাজন করার পরিকল্পনা আসলে বিজেপির রাজনৈতিক হতাশার প্রতিফলন। বিগত বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকে, সম্পূর্ণ কম্যুনিস্ট কায়দায়, পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিদ্বেষ গড়ে তোলার কাজ করে চলেছে বিজেপি। কম্যুনিস্টদের শ্রেণীশত্রুর অনুকরণে, বিজেপি জন্ম দিয়েছে জাতিশত্রুর। বাঙালীর সাথে অবাঙালীর, জেলার সাথে শহরের, এমনকি একই এলাকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যেও, নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে, পারস্পরিক বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ করে গেছে বিজেপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলি। এককালে এই পদ্ধতি নিয়েছিল বামপন্থীরা। কৃষকের সাথে জমির মালিকের দ্বন্দ্ব, শ্রমিকের সাথে কারখানা মালিকের দ্বন্দ্ব, ছাত্রের সাথে শিক্ষকের দ্বন্দ্ব ইত্যাদি। অথচ মজার কথা হলো, বিরোধরত প্রতিটা পক্ষেরই প্রতিনিধিত্ব করতো বামপন্থীরা। পশ্চিমবঙ্গে, নির্বাচনের আগে, বিজেপিও ঐ একই লাইন নিয়েছিল।

সমাজের এই ভেদাভেদকে কাজে লাগিয়ে, বিজেপি ভেবেছিল, বিরাট সাফল্য পাবে। কিন্তু নির্বাচনের ফলপ্রকাশের পর যখন সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় তখন সেটা গ্রহণ করা তাদের পক্ষে সহজ হয়না। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ছিল মোদী আর শাহর কাছে সম্মান রক্ষার লড়াই আর সেই লড়াইয়ে, অযোগ্য নেতাদের উপর নির্ভর করে, মোদী আর শাহ সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত। এই ফলাফলে তাদের হাত থেকে শুধু পশ্চিমবঙ্গই হাতছাড়া হয়নি, জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। আর ঠিক এই কারণেই, ফল প্রকাশের পর, রাজ্যপাল হোক বা সিবিআই, বিজেপির হাতে যা অস্ত্র আছে, সেগুলো বিজেপি প্রয়োগ করে যাচ্ছে যাতে মমতা ব্যাকফুটে থাকেন। 

এই খেলারই নতুন অঙ্গ হলো পশ্চিমবঙ্গকে ত্রিখন্ডিত করার প্রস্তাব। 'জাতীয় সুরক্ষার' স্বার্থে নাকি এটা আবশ্যিক। তাই গোর্খাল্যান্ড, জঙ্গলমহল আর মধ্যভূমি নিয়ে, রাজ্যকে তিন টুকরো করার প্রস্তাব হাওয়ায় ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। বিজেপির মতে, হিমালয় থেকে সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের একমাত্র রাজ্যকে তিন টুকরো করে দিলেই নাকি 'অপুত্রকের পুত্র হবে আর নির্ধনের ধন, মর্তে স্বর্গসুখ, মরলে বৈকুন্ঠ গমণ' একদম নিশ্চিত। গতকাল বিজেপির এক নেতার সাথে এই বিষয়ে কথা চলাকালীন তিনি বললেন যে বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে, রাজ্যকে ভেঙে, তিনটে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা নাকি আশু প্রয়োজন। আমি যখন পালটা জানতে চাইলাম যে বাংলাদেশের সাথে সীমান্ত তো আসাম আর ত্রিপুরারও আছে, সেখানেও কি একই পদক্ষেপ নেয়া হবে? তখন তার উত্তর যে ওখানকার পরিস্থিতি আলাদা।

আসলে পশ্চিমবঙ্গে পরাজয় বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব কিছুতেই মেনে নিতে পারছেনা। আর যে পরিমাণ অর্থ তারা খরচ করেছে, সেটার পর মেনে নেয়াও খুব সহজ নয়। দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা হোসপাইপে করে অর্থ ঢেলেছেন ঠিকই কিন্তু সেটা ঠিক যায়গায় পড়েছে কিনা সেটা নিয়ে তারা চোখ বুজে ছিলেন। আজ যখন চোখ খুলেছে তখন দেখছেন যে টাকাও নেই আর ক্ষমতাও নেই। কেন্দ্রে এককভাবে ৩০৩ জন সাংসদ আর খোদ এই রাজ্য থেকে ১৮ জন সাংসদ থাকলেও রাজ্যের নেতারা নিজেরা কেন্দ্রীয় নিরাপত্তার আড়ালে লুকিয়ে আছেন। নিজেদের আরামদায়ক ঘরে বসে, কর্মীদের আক্রান্ত হওয়ার কথা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে বড় বড় কথা বলে আর আক্রান্তদের ছবি দেখিয়ে টাকা তুলেই তাদের দৌড়ে শেষ। রাজ্য নেতারা একে অপরের নামে বিষোদগার করে যাচ্ছেন। প্রত্যেকেরই অভিযোগ যে অন্যজন টাকা খেয়েছে। এমতাবস্থায়, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বর কাছে কুমিরের শেষ বাচ্চা হলো রাজ্য ভাগ। তারাও জানে যে দলদাসরা, সব ভুলে, আবার ঝাঁপিয়ে পড়বে। তাই তো সেই নেতা অনায়াসেই বলতে পারেন যে, "লোকসভা নির্বাচন আসতে তো এখনও তিন বছর বাকি। ততদিনে সবাই সব কিছু ভুলে যাবে"।