Monday, July 10, 2023

রাজনীতির সেফটি ভালব

বাড়িতে প্রেসার কুকার তো প্রায় সবারই আছে কিন্তু সেটাতে যে সেফটি ভালব, যেটাকে সাদা বাংলায় আমরা 'সিটি' বলি, থাকে সেটার উপযোগিতা কখনও খেয়াল করেছেন? এই 'সিটি' বা সেফটি ভালব'টা বানানো হয় প্রেসার কুকারের আয়ু ও নিরাপত্তার কথা ভেবে। নীচে থেকে আসা তাপে প্রেসার কুকারের ভিতর যে বাস্পের প্রবল চাপের সৃষ্টি হয় সেটা যদি জমতেই থাকে তাহলে কুকারটা ফেটে যাবে। কিন্তু রান্না সম্পূর্ণ করতে গেলে যতটা চাপের প্রয়োজন সেটা একবারে তৈরী হয়না। এই দ্বিমুখী চাহিদার কথা ভেবেই তৈরী হয়েছে সেফটি ভালব। কুকারের ভিতরে চাপ খুব বেড়ে গেলে কিছুটা বাস্প সেটা বের করে দেয়, ফলে কুকার নিরাপদ থাকে আর নীচের থেকে নিয়মিত তাপের ফলে পুনরায় যে বাস্পচাপ তৈরী হয় সেটা খাবারকে সুসিদ্ধ করে তোলে।


এই ফর্মুলা মেনেই অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আমলা, অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। ১৮৫৭ সালে সিপাহীদের গুঁতো খাওয়ার পরে আরেকটা বিদ্রোহ ব্রিটিশ রাজ সামলাতে পারতনা। তাই তদানীন্তন ভাইসরয়, লর্ড ডাফরিনের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি এমন একটা মঞ্চ তৈরী করেন যা সশস্ত্র সংগ্রামের বদলে, আবেদনের মাধ্যমে দেশের মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ করবে। লালা-বাল-পালের অন্যতম লালা লাজপত রায়ও ২০১৬ সালে প্রকাশিত তার ইয়াং ইন্ডিয়া বইতে একই কথা বলেছেন। হিউমের দূরদৃষ্টি যে প্রখর ছিল সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। বিশেষত বাল গঙ্গাধর তিলকের পর যখন গান্ধীর হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যায় তখন থেকেই কংগ্রেস বিপ্লবীদের - ভগৎ সিং হোক বা সুভাষ বোস - পিছন থেকে ছুড়ি মারতে শুরু করে।


পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রহসন দেখার পর আজ যারা শুভেন্দু অধিকারী'র কিছু বক্তব্যে নিজেদের অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বাড়াচ্ছেন তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে এটাই সেই সেফটি ভালব থিওরিরই একটা অংশ। ৩০৩ জন সাংসদ নিয়ে নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকা মোদী-শাহ'র বিজেপি'র বিরুদ্ধে সমর্থকদের জমে ওঠা ক্ষোভ প্রশমনের এটা একটা উপায় মাত্র। কারণ নেতারাও জানে যে এই ক্ষোভের আয়ু বেশীদিন নয়। তাই ক্ষোভ যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায় তাই শুভেন্দু'র বাতেলা চলবে কিন্তু দিনের শেষে তারও ট্যুইটারে পিনড পোস্ট থাকবে মোদীর সাথে সাক্ষাতের ছবি। মেড়া তো তার খুঁটির জোরেই লড়ে, তাই না?

Saturday, June 24, 2023

বাঙালীত্ব

ভারতে, সঙ্ঘী আর কম্যুনিস্ট - উভয়ের কাছেই পৃথিবীটা দ্বিমাত্রিক। সঙ্ঘীদের কাছে "মছলিখোর বংগালী" সহী হিন্দু নয় আর ঠিক একইভাবে, কম্যুনিস্টদের কাছে, ভারতমাতার জয়ধ্বনি দেয়া বাঙালীরা আসল বাঙালী নয়।


এই কারণেই কিছু অমর্ত্য সেন বা সাগরিকা ঘোষের মত বাঙালীর দেশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্যে সঙ্ঘীরা বাঙালী সমাজকে কাঠগড়ায় তুলতে পারে কিন্তু তিস্তা শীতলবাড় বা হেমন্ত কারকাড়ের জন্যে তারা সম্পূর্ন মারাঠা জাতিকে নিয়ে কদর্য মন্তব্য করেনা অথবা হর্ষদ মেহতা, কেতন পারেখ বা নীরব মোদীর জন্যে সব গুজরাটিকেই চোর বলেনা। আসলে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলে সঙ্ঘীদের রাজনৈতিক অসাফল্য তাদের এই দুই জাতির বিরুদ্ধে আক্রোশের মূল কারণ।

উল্টোদিকে কম্যুনিস্টরা, যারা ভেনেজুয়েলাতে বৃষ্টি হলে কলকাতাতে ছাতা খুলে ঘোরে বা নিকারাগুয়ায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থানে পশ্চিমবঙ্গে বনধ ডাকে তারা কিন্তু কাশ্মীরে হিন্দু পন্ডিতরা জেহাদি অত্যাচারের কারণে গৃহচ্যুত হলে কোন প্রতিবাদ করেনা কারণ তারা বাঙালী নয়। ঘরের পাশে বাংলাদেশে অসহায় হিন্দু বাঙালীদের ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় আক্রমণেও কম্যুনিস্টদের কোন বনধ ডাকতে দেখা যায়না। হয়ত নিকারাগুয়া বা কিউবার নাগরিকদের থেকে বাংলাদেশের হিন্দুরা কম বাঙালী।

কিন্তু সৌভ্যাগ্যের বিষয় হল যে এই দুই মতাদর্শের বাইরেও হিন্দু বাঙালীর অস্তিত্ব ছিল, আছে এবং তাদের সংখ্যাই প্রতিদিন বাড়ছে যারা মছলিও খায় আবার বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে ভারত মাতার জয়ধ্বনিও দেয়। যারা গঙ্গার পবিত্র জলে অবগাহন করে, মা কালীর মূর্তির সামনে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্যে জীবনদানের শপথ গ্রহণ করতো, যাদের কাছে "বন্দেমাতরম" এখনও একটা প্রেরণা। তাদের কাছে, শুধুমাত্র "জয় শ্রী রাম" বলাই হিন্দুত্বের পরিচায়ক নয়, "জয় মা কালী" হুঙ্কারও তাদের দেহে অ্যাড্রেনালিনের ক্ষরণ বৃদ্ধি করে। যাদের কাছে হিন্দুত্ব আর বাঙালিত্ব বিপ্রতীপ নয়, সমানুপাতিক ও পরিপূরক।

বকচ্ছপ

সারা পৃথিবীতে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রেরণা মূলত দু'টি - অর্থ ও ক্ষমতা। সাধারণ হিন্দুরা, বিশেষত বাঙালীরা, সেটার সাথে আদর্শ'কে যোগ করে, 'রাজনৈতিক মতাদর্শ' নামক এমন একটা বকচ্ছপ বানিয়েছে যেটা তাদের না যোগাতে পারে অর্থ, না দিতে পারে ক্ষমতা বরং লাভের মধ্যে কেড়ে নেয় তাদের সামাজিক নিরাপত্তা।

সভ্যতা'র মাপকাঠি

সভ্যতার অগ্রগতি মানে শুধু উন্নত জীবনযাত্রা বা প্রযুক্তি নির্ভরশীলতা নয়, সভ্যতার অগ্রগতি মানে 'বিশ্বাস' থেকে 'কৌতূহল'-এ উপনীত হওয়া। সভ্যতা মানে নিজের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করে, অজানাকে জানতে চাওয়া। সভ্যতা মানে আত্মকেন্দ্রীক মানসিকতা থেকে সার্বজনীন উন্নয়নে আগ্রহী হওয়া। সভ্যতা মানে স্মৃতি ও কল্পনার বশীভূত না হয়ে জীবন উপভোগ করা।

Tuesday, August 9, 2022

হর ঘর তিরঙ্গা

স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে, দেশের অন্তত ২০ কোটি বাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগানোর জন্যে কেন্দ্র সরকার 'হর ঘর তিরঙ্গা' প্রকল্প নিয়েছে। এই প্রকল্পের অঙ্গ হিসাবে সব ডাকঘর থেকে জাতীয় পতাকা বিক্রি করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের অধীনে পতাকা সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে সালাউদ্দিন মন্ডল। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করার জন্যে ফ্ল্যাগ কোডে পরিবর্তন করেছে কেন্দ্র সরকার।

এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে প্রকল্পের সময়সীমা ১৩ থেকে ১৫ই আগস্ট হলেও জাতীয় পতাকার সম্মান কিন্তু চিরকালীন। তাই যারা এই প্রকল্পের অধীনে নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগাবেন তারা দয়া করে মাথায় রাখবেন যে ১৫ই আগস্টের পরেও যেন সেই পতাকা তার উপযুক্ত মর্যাদা পায়। বাড়ির উঠোনে বা রাস্তার পাশে পড়ে থাকা জাতীয় পতাকা শুধুমাত্র বিসদৃশ নয়, জাতির সম্মানের জন্যে যথেষ্ট অবমাননাকর।

প্রোফাইলে জাতীয় পতাকা লাগান, বাড়িতে পতাকা লাগান, ক্লাব, অফিস, দোকান - যেকোন যায়গাতেই জাতীয় পতাকা লাগান কিন্তু সেটা যেন কোন হুজুগের ফলে না হয়। জাতীয় পতাকা লাগানো তখনই সফল হবে যখন আপনার ভিতরে জাতীয় সত্ত্বার বিকাশ ঘটবে। জাতীয়তাবাদ জিনিসটা খুব একটা সস্তা নয়, এটা তাদেরই শোভা পায় যারা নিজেদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে গর্বিত।

Sunday, July 17, 2022

অতীত নির্ভরশীলতা

অতীতের মৌতাতে কেবল তারাই বুঁদ হয়ে থাকতে পারে যারা ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে ভয় পায়। ধীরুভাই কি করেছিলেন সেটা নিয়ে স্মৃতিমেদুর হয়ে থাকলে মুকেশ আম্বানি বিশ্বের অন্যতম ধনী হতেন না। শুধুমাত্র  সিনিয়র জর্জ বুশের শাসন নিয়ে গর্ব চালিয়ে গেলে জুনিয়র জর্জ বুশ আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হতেন না। বাজপেয়ীর প্রথম অকংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে মেতে থাকলে মোদী কখনই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।


অতীত যত সুখের বা আনন্দেরই হোক না কেন ভুলে গেলে চলবেনা যে সেটা অতীত। বর্তমান যদি শুধুমাত্র অতীত নির্ভর হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে বাধ্য। মাধ্যমিকে স্টার মার্কস পাওয়া কোন শিক্ষার্থী যদি সেই আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকে তাহলে উচ্চমাধ্যমিকে তার ফল কি হবে সহজেই অনুমেয়। অতীত প্রেরণা হতে পারে, শিক্ষা হতে পারে কিন্তু বর্তমানের নির্ণায়ক হতে পারেনা কারণ অতীত থেকে বর্তমানের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য আছে আর সেটা হলো মহাকাল।


অতীত আঁকড়ে থেকে যারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের জীবনযাত্রা বা আচরণে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে না পারে তারা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনা। বিশালদেহী ডাইনোসর বা ম্যামথরা পারেনি, হিন্দুরাও পারবেনা। গান্ধার থেকে ব্রহ্মদেশ অবধি বিস্তৃত ভারতের গরিমায় ডগমগ হিন্দুরা প্রায়শই ভুলে যায় যে গান্ধার বা ব্রহ্মদেশ - কোনটাই আজ ভারতের অঙ্গ নয়। হিন্দুদের বোঝা উচিত যে অতীতে দেশের বিরাট বিস্তৃতি যেমন সত্য ঠিক তেমনই সত্য তাদের বিযুক্তি। তারমানে অতীতে এমন ভুল নিশ্চয়ই হয়েছে যার পরিণতিতে দেশের সীমা সঙ্কুচিত হয়েছে। এমতাবস্থায়, শুধু "মা যা ছিলেন" নিয়ে গর্ব যথেষ্ট নয়। একইসাথে, "মা যা হয়েছেন" সেটার কারণও মনে রাখা দরকার যাতে "মা যা হইবেন" স্বপ্ন সফল হতে পারে।

Wednesday, June 29, 2022

অনিবার্য পরিণতি

রাজস্থানে মুসলমান জনসংখ্যার হার ১০ শতাংশের কম আর পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ৩০ শতাংশ। প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ মুসলমানদের হাতে তুলে দেয়ার জন্যে রাজস্থানে কোন বিশেষ আইন নেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে OBC-A সংরক্ষণের মোড়কে প্রতিটি সরকারি নিয়োগে বিশেষ সুবিধা দেয়া হচ্ছে মুসলমানদের। পুলিশ থেকে আমলা- সব পদেরই দখল চলে যাচ্ছে হিন্দুদের থেকে। এতদিন হিন্দু বহুল থাকার পরেও ক্রমাগত বঞ্চিত হয়ে আপনি এখনও নিশ্চিন্ত আছেন যে জেহাদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, প্রশাসনের ভরসায়, আপনার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যে আপনি খুব সুরক্ষিত পরিবেশ রেখে যাচ্ছেন, তাই না?


১০ শতাংশের কম জনসংখ্যা সত্ত্বেও মুসলমানরা নুপুর শর্মার গ্রেপ্তারির দাবীতে মিছিল করলে রাজস্থান সরকার তাদের বিরুদ্ধে নীরব থাকে আর হিন্দুরা নুপুর শর্মার সমর্থনে মিছিল করলে তাদের বিরুদ্ধে কেস ফাইল করা হয়। বাঙালীরা অবশ্য এই দৃশ্যের সাথে পরিচিত। তারা দেখেছে যে কিভাবে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হওয়ার কারণে টিকিয়াপাড়া দাঙ্গায় পুলিশ'কে লাথি মারা ব্যক্তির বাড়িতে সরকারি উদ্যোগে রেশন পৌছে যায় আর তেলেনিপাড়া দাঙ্গায় পুলিশের নিস্ক্রিয়তা প্রকাশ করার জন্যে, করোনা অতিমারীর সময় ত্রাণ বিতরণ করে আসার দিনই প্রসূন মৈত্র'কে গ্রেপ্তার করা হয়।


আরেকটা বিষয় জানিয়ে রাখা দরকার যে ১৫ই জুন কানহাইয়া লালের পুলিশে দায়ের করা অভিযোগ অনুসারে তার প্রতিবেশী, নাজিম এবং তার পাঁচ জন সহযোগী বেশ কিছুদিন ধরে কানহাইয়া লাল'কে দোকান খুলতেও বাধা দেয়। বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে কানহাইয়া লালের নাম ও ছবি দিয়ে প্রচারও করা হয় যে তাকে রাস্তায় বা দোকানে দেখলে যেন হত্যা করা হয়। পুলিশ, যথারীতি, তার অভিযোগকে কোন গুরুত্ব দেয়নি আর পরিণতিতে এই হত্যা।


তবে আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন যে আপনার প্রতিবেশীরা ওরকম নয়। কমলেশ তিওয়ারি, উমেশ কোলে, কানহাইয়া লালের মত পরিণতি আপনার হতেই পারেনা। তসলিমা'র বেলায় ফোর্ট উইলিয়াম থেকে সেনা ডাকতে হলেও বা জাতীয় সড়ক ও রেল স্টেশনে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরী হলেও বা প্রকাশ্য দিবালোকে সেনা ও পুলিশ অফিসারদের হত্যা করে বা বেধড়ক পিটিয়ে অপরাধীরা প্রমাণাভাবে বেকসুর খালাস হয়ে গেলেও আপনি নিশ্চিত থাকুন যে আপনার পরিবারের কোন বিপদ নেই। 


প্রতিটা হত্যার পরে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিন দুয়েক হল্লা হবে আর তারপর আবার উঠে আসবে নতুন ইস্যু। আজ রবি, রুদ্রেশ, অঙ্কিত সক্সেনা, পালঘর, কমলেশ তিওয়ারি, টোটোন দাস, মৌসুমি বিশ্বাস, বিকাশ দাস'দের কথা আর ক'জনের মনে আছে! আমাদের ক্ষোভের মেয়াদ প্রশাসনও জানে আর তাই তারা সেটা নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন হননা। আর আমাদের গুরু সমাজ তো আরেক কাঠি উপরে। তারা মরার পর আমি বিষ্ণুলোকে যাবো না ব্রহ্মলোকে সেটা নিয়ে প্রবচন দিতে পারেন, পরলোক নিরাপদ করতে শান্তি স্বস্ত্যয়ন করাতে পারেন কিন্তু ইহলোকের বিপদ সম্পর্কে তাদের মুখে টুঁশব্দ শুনবেন না। তাই যতই OBC-A দিয়ে অনুপ্রবেশ হোক, আপনার ধর্মীয় দায়িত্ব দক্ষিণেশ্বর, তারকেশ্বর বা তারাপীঠে পুজো দিয়েই শেষ। মাফ করবেন, এরকম সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে নিস্পৃহ, আত্মকেন্দ্রিক সমাজের ধ্বংস হয়ে যাওয়াই উচিত।

Monday, June 20, 2022

পশ্চিমবঙ্গ দিবস ও কিছু ভাবনা

আজ সোশ্যাল মিডিয়াতে যারা 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস' নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে আছেন তাদের মধ্যে ক'জন এই দিনের পিছনের ঘটনাবলী থেকে শিক্ষা নিয়েছেন সেটা নিয়ে আমি সন্দিহান। না, আমি শুধু হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের কথা বলছিনা বা তাদের একত্রে বসবাসের কল্পনার কথা বলছিনা। আজ যে পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হচ্ছে সেটা বাস্তবায়িত হওয়ার কারণ কিন্তু আরও গভীরে।


১৯৪৭ সালে, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির যৌথ অধিবেশনে যখন প্রথম ভোটাভুটি হয় তখন ১২০-৯০ ভোটে সিদ্ধান্ত হয় যে বাংলা অবিভক্ত থাকবে। ১৯৪৬ সালের গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস-এর কুখ্যাত নায়ক, হাসান সোহরাওয়ার্দী এবং শরৎ চন্দ্র বোসের মত ব্যক্তিরা বঙ্গ বিভাজনের বিপক্ষে দাঁড়িয়ে, সওয়াল করেন অখণ্ড বাংলার পক্ষে যা ভারত ও পাকিস্তান কোন দেশেই যোগ দেবেনা। ব্যাপারটা বোঝার জন্যে আজকে কাশ্মীরের মুসলমানরা যে দাবী করছে সেটার সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তখন, আজকের হিসেবে, পশ্চিমবঙ্গের প্রায় দুই কোটি জনসংখ্যার মধ্যে প্রায় ৬০ লক্ষ মুসলমান অর্থাৎ প্রায় ৩০% আর পূর্ববঙ্গের প্রায় চার কোটি জনসংখ্যার মধ্যে হিন্দু ছিল দেড় কোটির মতন যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৩%।


শরৎ চন্দ্র বোস বা সোহরাওয়ার্দী'র মত কিছু নেতা বা কৃষক প্রজা পার্টির মত দল স্বতন্ত্র বাংলার প্রচার করলেও, যা আদতে আরেকটা কাশ্মীরের জন্ম দিতো এবং সেই দূরদর্শিতার কারণেই, মুসলিম লীগের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগের দাবী সত্ত্বেও জিন্না কিন্তু সোহরাওয়ার্দীর দাবীকে সমর্থন করেছিলেন। এই দূরদর্শিতা ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায়েরও ছিল তাই তিনি ভারত ভাগের সাথে বাংলা ভাগের দাবীতে সোচ্চার হয়েছিলেন আর পাশে পেয়েছিলেন ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায়, নির্মল চন্দ্র চ্যাটার্জি, স্যার যদুনাথ সরকার, ডঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, ডঃ মেঘনাদ সাহা, ডঃ শিশির মিত্র, ডঃ সুনীতিকুমার চট্টপাধ্যায়, ডঃ সুরেন্দ্রনাথ মিত্র সহ আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের যারা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে অবিভক্ত বাংলার ছয় কোটি জনসংখ্যার পঞ্চাশ শতাংশ মুসলমান হলে সেখানে হিন্দুদের পরিণতি কি হতে পারে।


এবার আসি সেই ঘটনায় যেখান থেকে শুরু করেছিলাম এবং সেই শিক্ষা হিন্দুরা কতটা নিতে পেরেছে সেটা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলাম। লক্ষ্য করে দেখুন, সেই সময় ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন হিন্দু মহাসভার প্রতিনিধি আর বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের প্রাদেশিক আইনসভায় ছিল কংগ্রেসের আধিপত্য। এই ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান কিন্তু ডঃ মুখোপাধ্যায়ের নিজের জাতিকে রক্ষা করার প্রতি বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বরং তিনি এবং অন্যান্য বিশিষ্টজনেরা সম্মিলিতভাবে প্রাদেশিক সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন যাতে হিন্দুদের আলাদা হোমল্যান্ড তৈরী হয়। এরই পরিণতিতে, হিন্দু বহুল অঞ্চলগুলির প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত আইনসভাতে আলাদা হোমল্যান্ড গঠনের দাবী ৫৮-২১ ভোটে জয়ী হয় এবং জন্ম নেয় পশ্চিমবঙ্গ।


আজকে যারা 'পশ্চিমবঙ্গ দিবস' পালন করছেন তাদের মধ্যে কতজনের মধ্যে জাতির স্বার্থে রাজনীতির ঊর্ধ্বে ওঠার ইচ্ছা বা ক্ষমতা আছে সেটা নিয়েই আমি সন্দিহান। সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখার কুফল বাংলাদেশের হিন্দুরা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছে। বাংলাদেশের হিন্দুদের সিংহভাগ বংশপরম্পরায় আওয়ামী লীগের সমর্থক। ফলে বিএনপি তাদের গুরুত্ব দেয়না তারা তাদের ভোটার নয় বলে আর আওয়ামী লীগের কাছে তো তারা হাতের পাঁচ। জাতির স্বার্থে রাজনীতিতে কিভাবে ব্যবহার করতে হয় সেটা ডঃ শ্যামা প্রসাদ মুখোপাধ্যায় আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন এবং আমাদের যাবতীয় উদযাপন তখনই সফল হবে যখন আমরা তার প্রদর্শিত পথে চলতে পারবো।

Friday, June 17, 2022

অগ্নিপথ

দু'দিন আগে যারা বলতো যে সেনা মানে চাকরি নয়, আবেগ আর তাই সেটার আলাদা সম্মান আজ তারাই অগ্নিপথের লাভ বুঝাতে মাত্র চার বছর চাকরি করে লাখ টাকা জমানোর স্বপ্ন দেখাচ্ছে।


দু'দিন আগে যারা বলতো যে ভারতীয় সেনা মানে ত্যাগ আর নিষ্ঠার প্রতীক আজ অগ্নিপথের লাভ বুঝাতে তারাই বলছে যে সেনায় একবার ঢুকে গেলেই আরামে জীবন কাটানোর দিন এবার শেষ।


দু'দিন আগে যারা সারা বিশ্বে ভারতীয় সেনার শৌর্য নিয়ে, তাদের প্রাপ্ত আন্তর্জাতিক সম্মানের ইতিহাস নিয়ে আমাদের গর্ব করতে বলতো আজ অগ্নিপথ বুঝাতে গিয়ে তারাই বলছে যে সেনাতে এবার তরুণ রক্ত ঢুকে তার কর্মক্ষমতা বাড়বে।


আমি গোলা লোক, বুঝিনা কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। তবে দেশের প্রতিরক্ষাও যখন পরিসেবা, থুড়ি, পরিষেবা হয়ে গেছে তখন দেশকে তো তার মূল্য দিতেই হবে।

Sunday, June 5, 2022

OBC-A মামলা থেকে অব্যাহতি

আগেই বলেছিলাম যে আত্মদীপ-এর দায়িত্ব হচ্ছে বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্বের প্রতি সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করা আর সমাজ যদি সেই কাজে সহযোগিতা করে তাহলে এগিয়ে যাওয়া। এরকমই একটা বিষয় ছিল বৈষম্যমূলক OBC-A আইন নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা।


২০১২ সালে পাশ হওয়া OBC-A আইন নিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন সমালোচনা করলেও এটাকে বাতিল করার কোন উদ্যোগ নেয়নি। ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে আমরাই প্রথম এটাকে অসংবিধানিক বলে বাতিল করার দাবীতে আদালতে জনস্বার্থ মামলা করি এবং গত আড়াই বছর ধরে সেরা উকিলদের দিয়ে এই মামলা চালাতে থাকি। বিভিন্ন সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে আবেদনের প্রেক্ষিতে বা কিছু ব্যক্তি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সাহায্য করেছেন, আমরা তাদের কাছে কৃতজ্ঞ। প্রবাসী ভারতীয়রা দু-একটি শুনানির টাকা দিয়েছেন আমরা তাদের কাছেও কৃতজ্ঞ।


কিন্তু এইভাবে যে টাকা যোগার হয়েছে সেটা নিয়মিত মামলা চালানোর জন্যে যথেষ্ট নয়। ২৬শে এপ্রিলের পর পরবর্তী শুনানির তারিখ হিসাবে ১৪ জুন নির্ধারিত হয়েছে। এখন প্রতিটা শুনানির খরচ ২৫০০০ টাকা এবং বিশেষ শুনানির সময় সিনিয়র উকিল নিলে বাড়তি খরচ ১.৫ লক্ষ টাকা। এতবড় আর্থিক দায়ভার নেয়ার সামর্থ আমাদের এই মুহূর্তে নেই আর সমাজের বড় অংশ, যার মধ্যে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনও আছে, এই দায় নিতে অনাগ্রহী হওয়ার কারণে আমরা উপলব্ধি করেছি যে সমাজ এখনও এই আইনের বিপদ সম্পর্কে এবং ভবিষ্যতের ছবি সম্পর্কে সচেতন নয়। 


এমতাবস্থায়, আমাদের সংকল্প অনুযায়ী আমরা এই মামলা থেকে অব্যাহতি নিচ্ছি। ভবিষ্যতে সমাজ যদি আগ্রহী হয় আর তখন যদি পরিস্থিতি বিপদসীমা পার না করে গিয়ে থাকে তখন আবার এটা নিয়ে চিন্তা করবো।

Friday, May 20, 2022

ধার্মিক

জেহাদি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্যে, হিন্দুদেরও মুসলমানদের অনুকরণ করা জরুরী নয়। প্রত্যেকটা জাতির মানসিকতা, অভ্যাস, গঠন আলাদা। এক জাতির কাঠামো, আরেকজনের উপর বসিয়ে দিলে সেটা খাপ খায়না। যারা ভাবেন যে হিন্দুরা গন্ডা গন্ডা বাচ্চা প্রসব করলে জেহাদি প্রতিরোধ গড়ে উঠবে, আমি তাদের সাথে সহমত নই। যারা মুসলমানদের কাছে অত্যাচারিত হিন্দুরা কেন তাদের অত্যাচার নিয়ে সোচ্চার হননা বলে প্রশ্ন তোলেন, আমি তাদের প্রতি করুণা প্রকাশ করি।


আচ্ছা, বলুন তো, ভারত আর পাকিস্তানের লড়াই নিয়ে কত দিবস, কত সিনেমা তৈরী হয়েছে কিন্তু ভারত আর চীনের যুদ্ধ নিয়ে ক'টা দিবস বা ক'টা সিনেমা হয়েছে? না, ব্যর্থতাকে কেউ সেলিব্রেট করেনা। এই কয়েকদিন আগে, ডোকলাম নিয়ে চীনের সাথে যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, সেটার সমাধানেরও কোন দিবস পালন করা হয় কি? না, সমঝোতার মাধ্যমে লব্ধ বিষয়ে উল্লাস করা যায়না। এই কারণেই মুসলমানদের কাছে অত্যাচারিত হিন্দুরা তাদের অত্যাচার নিয়ে নীরব। পরাজয়ের কথা বুক ফুলিয়ে বলা যায়না।


একইভাবে, যারা মুসলমানদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারকে রোখার জন্যে হিন্দুদেরও গন্ডা গন্ডা বাচ্চা নিতে উৎসাহ দেন, তাদের সেই মানসিকতাকেও আমার অন্ধ অনুকরণ ছাড়া আর কিছু মনে হয়না। ভারতবর্ষ মুসলমানদের নয়, হিন্দুদের। মুসলমানরা এদেশে এসেছিল আক্রমণকারী হিসাবে, লুট করতে। তাই এই দেশের প্রতি তাদের কোন মমত্ব নেই। কিন্তু হিন্দুদের সেটা আছে। ভারতের বর্তমান জনসংখ্যা যেখানে ইতিমধ্যেই ১৩০ কোটি পার হয়ে গেছে আর রিসোর্স সীমিত - সেখানে, নেতাদের খিদে মেটানোর পর, নিয়ন্ত্রণহীন জনসংখ্যার প্রয়োজন কতটা মেটানো সম্ভব হবে?


ইসলামি আগ্রাসনের সামনে হিন্দুদের ব্যাকফুটে থাকার একমাত্র কারণ হল অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিন্দুরা ইসলামকে বিপদ বলে মনে করেনা। যেখানে হিন্দুদের সংখ্যা বেশী, সেখানে তারা মুসলমানদের ত্বাকিয়ার দ্বারা বিভ্রান্ত হয়ে থাকে আর এইভাবে আস্তে আস্তে যখন দুই পক্ষই সমান সমান অবস্থায় আসে, তখন তারা আপোষ করা শুরু করে আর মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে গেলেই, অনিবার্য পরিণতি হিসাবে এলাকা ত্যাগ করে। এই প্রবণতা দিনের পর দিন, এলাকার পর এলাকায় ঘটে চলেছে কারণ হেরে যাওয়ার গ্লানি সবাই লুকাতে চায়।


এমতাবস্থায় যারা ভাবছেন যে শুধু সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্গের মাধ্যমে এই আগ্রাসনকে প্রতিহত করা যাবে, তাঁরা, আমার মতে, বাস্তব সম্পর্কে অবহিত নন। ইসলামিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই মোটেই একমুখী নয় যে কুরুক্ষেত্রের মত এসপারওসপার হয়ে যাবে। এই লড়াই যতটা মাটিতে হবে, ঠিক ততটাই হবে বৌদ্ধিক জগতে। এই লড়াইয়ে রাজনৈতিক দলগুলি সহ তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রশাসনকে - নিজেদের স্বপক্ষে আনতে না পারলেও অন্তত নিস্ক্রিয় রাখতে হবে - যেটা ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময়, মোদী অনেকাংশেই করেছিলেন। আজ্ঞে হ্যাঁ, গুজরাট দাঙ্গার সময়, মোদী মোটেই গোধরাতে রেলের কামরা জ্বালিয়ে করসেবকদের পুড়িয়ে মারা এবং সেটাতে উল্লাস প্রকাশ করা জেহাদীদের উপর আক্রমণ করেননি, সেই কাজ গুজরাটের হিন্দুরাই করেছিল। মোদী শুধু কিছু সময়ের জন্যে প্রশাসনকে নিস্ক্রিয় করে রেখেছিলেন যাতে বিচারের সাম্যতা বজায় থাকে।


ইসলামিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই শুধু 'ব্লু কলার' বা 'কলারলেস'দের দিয়ে হবেনা, এই লড়াই করার জন্যে সমাজের 'হোয়াইট কলার'দের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সহযোগিতা অনিবার্য। যারা এই সত্যকে অস্বীকার করে, শুধু তথাকথিত নিম্নবর্গের দ্বারা এই কাজ করতে চাইছেন, তাদের সাফল্য নিয়ে আমার সংশয় আছে। কারণ প্রশাসনিক জাড্যতা ও আইনি বাধার বিরুদ্ধে তাদের শক্তি এতটাই ক্ষয় পায় যে অনেক সময়ই মূল লক্ষ্য থেকে দৃষ্টি সরে যায়। সমাজ রক্ষার, ভবিষ্যৎ রক্ষার দায় যে গোটা সমাজের, এই বোধ সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের মধ্যেই আসতে হবে। হিন্দুদের একজোট হওয়ার জন্যে ধর্ম ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। তাই সমাজ রক্ষার এই কাজ যে হিন্দুদের ধার্মিক কর্তব্য, এই উপলব্ধি হিন্দুদের মধ্যে আসা দরকার। 


এখানে ধর্ম মানে রিলিজিয়ন নয়, ধর্ম মানে দায়িত্ব, কর্তব্য। ঈশ্বরে বিশ্বাস বা অবিশ্বাস, যাগযজ্ঞাদি, পূজার্চনা করা বা না করার সাথে মানুষের সামাজিক কর্তব্যের বা ধর্ম পালনের কোন সম্পর্ক নেই। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী, বাজপেয়ী'র সৌজন্যে যেমন 'রাজধর্ম' শব্দটি বহুল পরিচিতি লাভ করেছে এবং সেখানে রাজধর্ম মানে মোটেই শাসকের পূজার্চনার কথা বোঝানো হয়নি, বরং তার কর্তব্যের কথা বলা হয়েছে। একইভাবে, পুত্রধর্ম, ছাত্রধর্ম, পিতাধর্ম, শিক্ষকধর্ম ইত্যাদি দ্বারাও প্রত্যেক ক্ষেত্রের ব্যক্তিদের দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। ঠিক এইভাবেই থাকে নাগরিক দায়িত্ব যা তার ধর্ম আর এই ধর্ম যে ঠিকভাবে পালন করে সেই ধার্মিক।

Wednesday, May 18, 2022

বাঙালীর অস্তিত্ব

পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইদানীং যে বাঙালীবাদ অথবা বাঙালী জাতীয়তাবাদের ধুয়ো উঠছে সেটা 'অনুপ্রেরণা' মূলত রাজনৈতিক। আরও স্পষ্ট করে বলতে গেলে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির উত্থানকে প্রতিহত করাই এই হঠাৎবাদের উৎস। প্রথমে এটা শুরু হয়েছিল তথাকথিত হিন্দি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, কিন্তু হিন্দির বিরুদ্ধে মুখর হয়ে, উর্দুর বিরুদ্ধে মৌন থাকার চালাকিটা রাজ্যের ঘরপোড়া মানুষ বুঝে ফেলতেই এখন হিন্দি আর উর্দু- উভয়কেই নিশানা করা হচ্ছে।


কিন্তু এই তথাকথিত বাংলাপ্রেমীদের (অন্য অর্থে নেবেন না) মূল সমস্যা হল যে তাদের হিসাবে ভাষাই জাতির একমাত্র পরিচায়ক। তাই তাদের কাছে, দেশের পূর্বদিকের সীমান্তের পূর্ব ও পশ্চিমে বসবাসকারী উভয়েই বাঙালী। তাদের মনে কি কখনও প্রশ্ন জাগেনা যে উভয়পারের লোকের পরিচয় যদি বাঙালীই হবে তাহলে মাঝখানে সীমান্তটা আসলো কেন? হয়তো জাগে, কিন্তু রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা এবং কাঞ্চনমূল্যে সেই প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। তারা বোঝেনা বা বুঝতে চায়না যে ভাষা কখনও জাতির একমাত্র পরিচায়ক হতে পারেনা, কোন জাতির পরিচয় হল তার সংস্কৃতি। সীমান্তের পশ্চিমপারে বাঙালীদের সংস্কৃতি আর পূর্বপারে বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি এখন আর এক নয়। সুজলা সুফলা পূর্বপারের অধিকাংশ মানুষ তাদের জন্যে এমন এক মরু সংস্কৃতিকে গ্রহণ করেছেন যেটা অন্য কোন সংস্কৃতির অস্তিত্ব মেনে নিতে পারেনা। আর সেই কারণেই রামধনু হয়ে যায় রঙধনু আর বামিয়ানের বুদ্ধমূর্তির মত, ঢাকাতেও ভাঙা হতে থাকে মন্দির, মূর্তি। কারণ সেটা সেই মরু সংস্কৃতি অনুসারে, হারাম।


আগেই বলেছি যে এই হঠাৎবাদের অনুপ্রেরণা ও স্পনসর যেহেতু রাজ্যের বর্তমান শাসক দল এবং একমাত্র লক্ষ্য বিজেপির অগ্রগতি রোধ করা, তাই বাজারে আরও একটা নতুন তত্ত্ব আসছে আর সেটা হল বাঙালী জাতীয়তাবাদ। বিজেপি যেহেতু হিন্দু জাতীয়তাবাদকে পুঁজি করে আন্দোলন করছে, তাই সেই আন্দোলন থেকে বাঙালীদের আলাদা করা (পড়ুন ভোট কাটা) এই নতুন দলের লক্ষ্য। আর এই লক্ষ্যে মূলত তারাই কাজ করছে যারা এতদিন বিজেপির দুয়ারে হত্যে দিয়ে পড়েছিল আর এখন সেখানে পাত্তা না পাওয়াতে তাদের মনে হয়েছে যে বিজেপিকে দিয়ে কিছু হবেনা। ভাবটা এমন যেন বিগত দশ বছরে বিজেপিই এই রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল আর কাংলাপাহাড়িতে দুর্গাপূজা বন্ধ বা তেহট্ট হাই স্কুলে সরস্বতীপূজা বন্ধ বিজেপিই করেছে। মহরমের জন্যে বিসর্জন বন্ধ করা বা তোতোন দাস, রোহিত তাঁতিদের হত্যাও হয়েছে বিজেপি প্রশাসনের কারণে। সমুদ্রগড়ের নিরীহ ছেলেদের, শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে, গাঁজা কেসে ফাঁসিয়ে, তিন বছর ধরে আটকে রেখেছে বিজেপি প্রশাসন আর তারক বিশ্বাসকে গ্রেপ্তারও করেছিল বিজেপি প্রশাসন। এরপর হয়তো শুনবো যে ইমামভাতা আর OBC-A সংরক্ষণ আইনও বিজেপিরই অবদান। সত্যি, মানুষকে এতটা বোকা ভাবেন? ভাবতে পারেন?


শাসকদলের মদতপুষ্ট যে সংগঠনগুলি হিন্দির 'আগ্রাসন', বকলমে রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে সোচ্চার তাদের কিন্তু বাংলার সংস্কৃতি রক্ষায় আগ্রহ নেই। বাংলার ধ্বংসপ্রাপ্ত মন্দিরগুলি সংরক্ষণ করার বা বাংলার লৌকিক পরম্পরাকে তুলে ধরতে তারা বিমুখ। তাদের কাজ খালি রেলওয়ে স্টেশনের নামের বোর্ডে হিন্দির উপর কালি লাগিয়েই শেষ। যদিও একই হিন্দি আর উর্দু মমতা ব্যানার্জী'র সরকারি লেটারহেডে থাকলে তাদের কোন আপত্তি নেই, প্রতিবাদ নেই। যার নুন খাচ্ছে তারই বদনাম করবে, এতটা 'নিমক হারাম' তারা নয়।


আজ বাংলা ভাষা যেভাবে এই রাজ্যে নিজের স্থান হারাচ্ছে তার জন্যে হিন্দি বা উর্দু দায়ী নয়, দায়ী বাঙালীরা। হিন্দির আগ্রাসন যদি সত্যিই বিপজ্জনক হতো তাহলে দক্ষিণ ভারতীয় রাজ্যগুলি এর প্রভাবমুক্ত থাকতে পারতনা। কিন্তু ঘটনা হলো যে অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, কর্ণাটক বা কেরালাতে হিন্দি মোটেই কোন বিপদ নয়। অনুকরণ প্রিয় বাঙালী নিজেদের বিয়ের অনুষ্ঠানে ঐতিহ্যবাহী ফুলের সাজের বদলে কুন্দন জুয়েলারি পরবে, ধুতি-পাঞ্জাবির বদলে শেরওয়ানি পরবে, রেড মিটের দোহাই দিয়ে মাংস-ভাত ছেড়ে চেটেপুটে মাটন বিরিয়ানি খাবে, আর তারপর কাঁদুনি গাইবে যে সংস্কৃতি বিপন্ন। বাংলা সিনেমা আর গানের কথা তো বাদই দিলাম। যে বাংলা চলচ্চিত্র আগে বম্বের সিনেমা জগতে ছড়ি ঘোরাতো আজ সেই বাংলা চলচ্চিত্রের প্রতিনিধি হয়ে গেছে মোহতা''রা। পরিচালকের রাজনৈতিক রঙ দেখে স্থির করা হচ্ছে কোন সিনেমা নন্দনে স্থান পাবে। হিন্দি বা ইংরেজি সিনেমার যেকোন সহ-অভিনেতা আজ অভিনয়ের মাপকাঠিতে বাংলা সিনেমার অধিকাংশ শিল্পীকে বলে বলে দশ গোল দেবে।


কিছুদিন আগেই কেরালা ঘুরতে গিয়েছিলাম, সেখানে কাউকে খৈনী বা গুঠখা খেতে দেখলাম না। সাধারণ লোকেরা এখনও আপ্পাম, ইডলি বা ধোসা খুশি মনে খায়। ম্যাক ডি বা কেএফসি'র আধিপত্য নেই। রাস্তার বিভিন্ন বিজ্ঞাপনেও স্থানীয় অভিনেতাদের ছবি। একটা জাতি এমনিতেই শ্রেষ্ঠ হয়ে যায়না, তার জন্যে কয়েকটা প্রজন্মকে স্বাভিমান বোধ বজায় রাখতে হয়। বাঙালী যেদিন সেটা বুঝবে, তাকে আর সস্তার রাজনীতি করে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে হবেনা।

Sunday, May 8, 2022

বঙ্গ রাজনীতিতে ২০২৪

আপনাদের, মানে বিজেপি ভক্তদের, বারবার বলি, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেই তবুও আপনারা খেলাটা বোঝেন না বা বুঝতে চাননা। আপনারা যতই লাফালাফি করুন না কেন, ২০২৪ এ নরেন্দ্র মোদী কে তৃতীয়বারের জন্যে প্রধানমন্ত্রী দেখতে হলে বঙ্গ বিজেপি কে অনেক বলিদান দিতে হবে। আপনাদের সহকর্মী খুন হবে, খুনের দায়ে অভিযুক্তকেই সাদরে দলে নেয়া হবে, বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থা মাঝেমধ্যে রাজ্যে এসে হম্বিতম্বি করে আপনাদের অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বাড়াবে কিন্তু দিনের শেষে হাতে পড়ে থাকবে শুধুই পেনসিল। আজ যে ইস্যু নিয়ে বাজার গরম করা হচ্ছে কাল সেটা ভুলেই যাবেন কারণ বাজারে নতুন ইস্যু এসে গেছে।


এখন প্রশ্ন হচ্ছে যে ২০২৪ কেন, সেটা এমন কি বিশেষ সাল? ২০২৪ হলো প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসাবে নরেন্দ্র মোদীর শেষ নির্বাচন। ২০২৪ নির্বাচনের সময় ওনার বয়স হবে ৭৪ বছর অর্থাৎ ২০২৯ এ ওনার বয়স হয়ে যাবে প্রায় আশি। ভগবান ওনাকে দীর্ঘায়ু করুন কিন্তু সেই ঝুঁকি বিজেপি কতটা নিতে পারবে বা সেই সময় মোদী বাবুর স্বাস্থ্য কতটা স্বাভাবিক থাকবে সেটা নিয়ে আমি সন্দিহান। তাই ২০২৪ এ মোদী জিতলে, এবং সেটা প্রায় নিশ্চিত, তার শাসনকালেই উত্তরসূরী নিয়োগ হয়ে যাবে বলে আমার ধারণা। এতে মোদীর লিগ্যাসি আর উত্তরসূরীর ইমেজ - দুটোই ২০২৯ এ বিজেপি'র পক্ষে লাভজনক হবে। ঠিক যেমন জ্যোতি বসু আর বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য'র ক্ষেত্রে হয়েছিল।


এবার মোদীর উত্তরসূরী কে হবেন সেটা লাখ নয়, কোটি টাকার প্রশ্ন। সমর্থকদের কাছে যোগী আদিত্যনাথ প্রথম পছন্দ হলেও গুজরাটের প্রতিনিধি হওয়ার কারণে কর্পোরেট লবির পছন্দ হলেন অমিত শাহ। শাহ'র জনপ্রিয়তা ও কঠোর প্রশাসকের একটা ভাবমূর্তি থাকলেও সেটা অনেকটাই মোদী নির্ভর এবং তার শারীরিক অবস্থাও একটা বড় প্রতিবন্ধক। যোগীর ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তা একটা বড় অ্যাডভান্টেজ। নিজের দ্বিতীয় পর্যায়ের শাসনে তিনি যদি, পূর্বের মতই, সমাজের সকল শ্রেণীকে শুধুমাত্র হিন্দু পরিচয়ে মিলিত করতে পারেন তাহলে তিনি দিল্লীর সিংহাসনের বড় দাবীদার হয়ে উঠবেন। কখনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী না হলেও পরপর পাঁচ বার লোকসভা নির্বাচনে জয়লাভ এবং প্রায় দুই দশকের দিল্লীর রাজনীতির সাথে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত থাকা তার জন্যে একটা বড় অ্যাডভান্টেজ। এই দুজন ছাড়াও, নিতিন গডকড়ি বা রাজনাথ সিং এর মত কিছু নেতা দৌড়ে থাকলেও তাদের সম্পর্কে আমি আশাবাদী নই। তাদের একমাত্র সুযোগ যদি বিজেপি এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পায় এবং সরকার গঠনের জন্যে সহযোগী দলগুলোর উপর নির্ভর করতে হয়। তবে এত বড় বড় নামের মধ্যে আমার হিসাবে একজন 'কালো ঘোড়া' আছেন আর তিনি হলেন হিমন্ত বিশ্বশর্মা। এ নিয়ে পরে কখনও লেখা যাবে।


এই হলো ২০২৪ এর মাহাত্ম্য। তাই ২০২৪ পর্যন্ত বঙ্গ বিজেপিকে বলিদান দিয়ে যেতেই হবে। কংগ্রেসকে নির্মূল করার জন্যে মোদীর কাছে মমতা ব্যানার্জী'র গুরুত্ব কতটা সেটা আগেই লিখেছি। আগ্রহীরা নীচের লিঙ্কে সেটা পড়ে নিতে পারেন। ২০২৪ এর ফল অনুযায়ী, সোজা কথায় বিজেপি'র প্রাপ্ত আসন সংখ্যা অনুযায়ী, তৈরী হবে বিজেপির পরবর্তী বঙ্গ বিজয়ের পরিকল্পনা। ততদিন বঙ্গ বিজেপির কর্মীরা শুধু লোকসভা নির্বাচন মাথায় রেখেই কাজ করে যান।


https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=10158659084199865&id=620989864