Wednesday, March 20, 2024

গণতন্ত্র ও নির্বাচন

যেকোন 'তন্ত্র' সফল হওয়ার জন্যে যার নামে তন্ত্র, তার শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন। যেমন, রাজতন্ত্রে যদি রাজা দুর্বল হয়ে যায় তাহলে দেশে মাৎস্যন্যায় দেখা দেয়। একনায়কতন্ত্রে যদি সেই একনায়ক দুর্বল হয়ে যায় তাহলে তার দশা কি হয় তার জ্বলজ্যান্ত প্রমাণ চেসেস্কু। দলতন্ত্রে যদি দল দুর্বল হয়ে যায় তাহলে তার পরিণতি কি হয় তার প্রমাণ পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম।


একইভাবে, গণতন্ত্র সফল হওয়ার জন্যে জনগণের শক্তিশালী হওয়া আবশ্যক। সেটা না হলে শাসক রাষ্ট্রক্ষমতার অপব্যবহার করবেই। শুধু পাঁচ বছর অন্তর ভোট দেয়াই গণতন্ত্র নয়, প্রকৃত গণতন্ত্র হল শাসকের উপর জনগণের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা। আধুনিক যুগের ইতিহাসে পৃথিবীর প্রাচীনতম গণতান্ত্রিক দেশ আমেরিকাতে জনগণ এই নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে বলেই প্রবল প্রতাপান্বিত আমেরিকার রাষ্ট্রপতি, নিক্সনকে নিছক ফোনের বার্তালাপ বিনা অনুমতিতে রেকর্ড করার জন্যে ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারিতে ইস্তফা দিতে হয়। 


আমেরিকার দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সাপেক্ষে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাস নেহাতই শিশু তাই আমরা প্রায়শই ভুলে যাই যে কেন্দ্র বা রাজ্যের শাসকদলের প্রশংসা করা জনগণের দায়িত্ব নয়, সে কাজের জন্যে তাদের যথেষ্ট সক্ষম ও শক্তিশালী মিডিয়া টিম আছে। জনগণের দায়িত্ব তাদের ত্রুটি, বিশেষত সেগুলো যেগুলোকে তারা অর্থ ও জনবল দ্বারা ঢাকতে চায়, প্রকাশ করা। তাদের যে কাজের ফলে তাদের রাজনৈতিক লাভ হলেও সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে সেগুলিকে তুলে ধরা। কিন্তু তারপরেও পাঁচ বছর পর আসে সেই একটা দিন যেদিন জনগনকে সিদ্ধান্ত নিতে হয় যে তারা কার হাতে পরবর্তী পাঁচ বছরের দায়িত্ব তুলে দেবে। আগামী ১৯শে এপ্রিল থেকে ১লা জুন অবধি দেশের বিভিন্ন অংশে খন্ডে খন্ডে আসবে সেই দিন যখন জনগণকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে দেশের দায়িত্ব কার হাতে দেবে।


প্রশ্ন যখন সার্বিকভাবে দেশের তখন আমি কখনোই কোন আঞ্চলিক দলকে সেই দায়িত্বভার দেবনা। কারণ যেকোন আঞ্চলিক দল খুব স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক স্বার্থে তাদের ক্ষুদ্র অঞ্চল নিয়ে এতটা সংবেদনশীল থাকে যে দেশের বৃহত্তর স্বার্থকে তারা উপেক্ষা করে। তাছাড়া একাধিক রাজনৈতিক দল একজোট হয়ে যদি কেন্দ্রে কোন সরকার গঠন করে তাহলে তাদের স্থায়িত্ব যে কতটা ক্ষণস্থায়ী হয় তার দৃষ্টান্ত দেবেগৌড়া বা গুজরাল সরকারের পরিণতি হিসাবে আমাদের সামনেই আছে।


জাতীয় দল হিসাবে কংগ্রেসকেও আমি বেছে নেবনা তার কারণ জাতীয় নিরাপত্তা নিয়ে তাদের আপোষের ইতিহাস। নেহেরুর সময় চীন আগ্রাসন হোক বা নৌসেনা ও উপকূল রক্ষী বাহিনীকে সরিয়ে নিয়ে দাউদ ইব্রাহিমকে বম্বেতে বিস্ফোরক প্রবেশে সাহায্য - সবই হয়েছে কংগ্রেস আমলে। তাদের না বাছার আরেকটা কারণ হলো তাদের জিনে থাকা হিন্দুবিদ্বেষ। গভীর রাতে শঙ্করাচার্যকে মিথ্যা মামলায় গ্রেপ্তার করা হোক বা ওয়াকফ আইন, ধর্মস্থান সংক্রান্ত আইন - সব ক্ষেত্রেই তাদের নেতৃত্বের হিন্দু বিদ্বেষ ফুটে উঠেছে।


নোটা কখনোই আমার পছন্দ হবেনা কারণ বর্তমান প্রেক্ষিতে সেটা ভোট নষ্ট করা ছাড়া আর কিছু নয়। নোটা'তে এক লক্ষ ভোট পড়লেও সেটা হাজার ভোট পাওয়া প্রার্থীকে হারাতে পারবেনা যদি সেটা বাকি প্রার্থীদের মধ্যে সর্বাধিক হয়। তাছাড়া সামাজিক কাজে আমাদের নিয়মিত যাদের সাথে সাংস্কৃতিক সংঘাত হয় এবং ভবিষ্যতেও হবে তারা কখনোই নোটা'তে ভোট দেবেনা, দেবে কৌমের স্বার্থে।


এমতাবস্থায় আমারও কর্তব্য স্বজাতির স্বার্থ সুরক্ষিত করার জন্যে ভোট দেয়া। আর সেটা করতে গিয়ে আমি কখনোই কোন দলকে "অতটা হিন্দুত্ববাদী নয়" বলে হিন্দুবিদ্বেষী কোন দলকে নিজের মূল্যবান ভোট দেবনা। হ্যাঁ, ভোট দেয়ার আগে অবধি নিজের ভোটের মূল্য উসুল করতে সেই দলকে দেশের ও স্বজাতির স্বার্থ রক্ষার জন্যে বাধ্য করাটাও আমারই দায়িত্ব আর সেই কাজ করার দায়িত্ব আমি অন্য কাউকে ইজারা দিয়ে নিশ্চিন্তে থাকতে পারিনা কারণ দেশও আমার আর সংস্কৃতিটাও আমার। এর রক্ষা আমার দায়িত্ব।

Saturday, February 10, 2024

নরসিংহ রাও ও ভারতরত্ন

পি ভি নরসিংহ রাও'কে ভারতরত্ন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক। বাবরি মসজিদ ভাঙার সময় প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বিরত রাখা (দৈনন্দিন পূজা উপলক্ষে) আর মনমোহন সিংহ'কে মুক্ত অর্থনীতি প্রণয়নের স্বাধীনতা নেয়া দেয়া ছাড়া জাতীয় স্বার্থে তার আর খুব বেশী অবদান নেই। যদিও সেই সময় সঙ্ঘ পরিবার মুক্ত অর্থনীতির তুমুল বিরোধিতা করেছিল। স্বদেশী জাগরণ মঞ্চ নামে একটা অভিযান শুরু করেছিল। আমার মনে আছে, ১৯৯২ সালে কল্যাণী শিবিরের সান্ধ্যকালীন বৈঠকে RSS-এর তদানীন্তন সহঃ সরকার্যবাহ, মদন দাস দেবী, এই নিয়ে বিশেষ প্রবচনও দিয়েছিলেন।


নরসিংহ রাওয়ের আমলেই পাশ হয় Places of Worship Act (1991) যা অনুসারে ভারতের সব ধর্মস্থানের স্থিতাবস্থা ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট অনুযায়ী বহাল রাখতে হবে। ওয়াকফ অ্যাক্ট (১৯৯৫) যা অনুসারে ওয়াকফ বোর্ড যেকোন সম্পত্তিকে নিজেদের বলে দাবী করতে পারে আর সেটা অপ্রমাণের দায় প্রতিবাদীর। হর্ষদ মেহতার থেকে ১ কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ হোক বা সংসদে আস্থা ভোটে জেতার জন্যে ঝাড়খণ্ড মুক্তি মোর্চার সদস্যদের টাকা দেয়ার মামলা হোক, নরসিংহ রাওয়ের ইমেজ মোটেই নিষ্কলুষ নয়। তার দুর্বল মেরুদন্ডের আরেকটা বড় দৃষ্টান্ত হলো সব ব্যবস্থা হয়ে যাওয়ার পরেও আমেরিকার চাপে পারমাণবিক পরীক্ষার সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে যাওয়া। পরে বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী হবার পরে তাকে বলেছিলেন যে "আমি সব ব্যবস্থা করে গেলাম, আপনি প্রয়োগ করবেন"। তবে তার একটা বড় কৃতিত্ব হলো গান্ধী পরিবারের বাইরে, প্রথম কংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে, সাফল্যের সাথে পাঁচ বছর সংখ্যালঘু সরকার চালানো। 


আমি মনে করি যে কোন অন্যায় সিদ্ধান্ত যদি ভাল উদ্দেশ্য সাধন করার জন্যে নেয়া হয় তাহলে সেই সিদ্ধান্ত মোটেই অন্যায় নয় মানে End justifies the means। সত্য, শিব আর সুন্দর পরস্পর সম্পৃক্ত। কোন অসুন্দর পথে শিবে উপনীত হওয়া যায়না আর শিবে উপনীত হওয়ার কোন পথই অসুন্দর হতে পারেনা। এই কারণেই আমি ব্যক্তিগতভাবে নরসিংহ রাওকে ভারতরত্ন সম্মানের যোগ্য মনে না করলেও তাকে এই সম্মান প্রদানের নরেন্দ্র মোদীর এই সিদ্ধান্তের সাথে সহমত। এই সম্মান দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলিতে মোদীর গ্রহণযোগ্যতা বাড়াবে। কংগ্রেসে থেকে, গান্ধী পরিবারের স্তাবক না হয়েও যে আলাদা উচ্চতায় ওঠা যায় সেটা মনে করিয়ে দেবে এবং একইসাথে RSS কেও তাদের চিন্তাভাবনার সীমাবদ্ধতা বুঝিয়ে দেবে।

Tuesday, February 6, 2024

সম্প্রদান

ইদানীং কিছু যাদবপুরী বিজ্ঞ কন্যাদানে আপত্তি জানাচ্ছে। তাদের মতে কন্যা কোন বস্তু নয় যে তাকে দান করা যাবে। এই বিজ্ঞরা হয়তো কালকে 'জীবনদান' বা 'মতদান' নিয়েও একই আপত্তি তুলবে। কিন্তু এই হঠাৎ বিজ্ঞদের জানা নেই যে বিবাহ একটা সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া আর কন্যা সম্প্রদান তার একটা অংশ বিশেষ।

"ওঁ এতস্যৈ সবস্ত্রায়ৈ সালঙ্কারায়ৈ কন্যায়ৈ নমঃ"

মন্ত্র বলে যে কন্যাকে সম্প্রদান করা হয় সে কতটা অসাধারণ তার বর্ণনা রয়েছে পরবর্তী আচার গ্রন্থিবন্ধনে।

"সাবিত্রী সত্যভামা হিমগিরিতনয়াহুরুন্ধতী জহ্নূকন্যা লোপামুদ্রা সুভদ্রাহদিতি রতি কমলা রুক্মিনী রেবতী চ। রম্ভা মেনা যশোদা সুরূপতিবনিতা কৈটভি বানপুত্রী, সৌভাগ্যং পুত্রলাভং সকলশুভকরং মঙ্গলং বো দিশ্ম।"

হ্যাঁ, কন্যা, যার উৎপত্তি কম ধাতু অর্থাৎ কামনা থেকে, হলো মা-বাবার শ্রেষ্ঠ কামনার ধন তথা কাম্য অভিজ্ঞান। আর সেই ঐশ্বর্যকে আরও মহিমান্বিত করা হয় সে কোন সংস্কৃতির প্রতিনিধি সেই বিবৃতি দ্বারা। সাবিত্রী, সত্যভামা, পার্বতী, অরুন্ধতী সহ অন্যান্য মহীয়সীদের সার্থক উত্তরসূরী এই কন্যাকে দান করার মত উদারতা দাতার থাকতে হয় আর সেই দান গ্রহণ করে, তাকে রক্ষা করার যোগ্যতা গ্রহীতার থাকতে হয়। তাই বলা হয় - 

"দূর্বাপুষ্পং ফলঞ্চৈব বস্ত্রং তাম্বুলমেবচ

এভি কন্যা ময়া দত্তা রক্ষণং পোষণং কুরু।"

এই মহার্ঘ দান গ্রহণ করার পর গ্রহীতার যাতে কোন হীনমন্যতা না আসে তাই পরবর্তী মন্ত্রই হচ্ছে

"ওঁ যথেন্দ্রানী মহেন্দ্রস্য; স্বাহা চৈব বিভাবসোঃ। রোহিনী চ যথা চন্দ্রে, দময়ন্তী যথা নলে। যথা বৈশ্রবনেভদ্রা, বশিষ্টে চাপ্যরুন্ধতী। সীতা চ রামচন্দ্রে, গৌরীশঙ্কর এব চ, যথা- নারায়নে লক্ষী স্তথাত্বং ভব ভর্ত্তারি।"

একের পর এক পারফেক্ট কাপলের উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হচ্ছে যে সম্পর্কটা ঠিক কেমন হবে। দান ও গ্রহীতা যাতে পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পারে সেই লক্ষ্যেই হয় গ্রন্থিবন্ধন।

Tuesday, January 16, 2024

হাইকোর্টে অ-ইংরেজি ভাষার ব্যবহার


বিচারপতি গঙ্গোপাধ্যায়ের এই সিদ্ধান্তকে সম্পূর্ণ সমর্থন করি। হিন্দি বলয়ে যখন আদালতের কাজকর্ম হিন্দি ভাষায় হয়, পশ্চিমবঙ্গে সেটা বাংলায় বা তামিলনাড়ু'তে তামিল ভাষায় হলে সংবিধান অশুদ্ধ হয়ে যাবেনা। আর নেহাতই যদি কোর্ট ল্যাঙ্গুয়েজ সংক্রান্ত ৩৪৮(১)(এ) ধারা বা ২১শে মে, ১৯৬৫ সালের ক্যাবিনেট কমিটির সিদ্ধান্ত যা অনুসারে কোন হাইকোর্টে ইংরেজি ছাড়া অন্য ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির অনুমতি আবশ্যক হওয়া অশুদ্ধ হয়, সেক্ষেত্রে উপযুক্ত সংশোধন অবিলম্বে করা উচিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে তামিলনাড়ু, গুজরাট, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তিসগড় এবং কর্ণাটক সরকার বছরখানেক আগেই সংশ্লিষ্ট রাজ্যের হাইকোর্টে যথাক্রমে তামিল, গুজরাটি, বাংলা, হিন্দি ও কন্নড় ভাষা ব্যবহারের অনুমতি চেয়েছিল যা কেন্দ্র সরকার সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে পাঠানো হয় এবং সুপ্রিম কোর্টের ফুল বেঞ্চ সেই প্রস্তাব খারিজ করে দেন যদিও ১৯৫০ সালে সংবিধানের ৩৪৮(২) অনুসারে  রাজস্থান, উত্তর প্রদেশ (১৯৬৯), মধ্যপ্রদেশ (১৯৭১) বা বিহারের (১৯৭২) ক্ষেত্রে হিন্দি ভাষায় কোর্টের কার্যাবলী পরিচালনের অনুমতি দিতে সুপ্রিম কোর্ট আপত্তি করেনি। ঔপনিবেশিক দাসত্ব থেকে মুক্তির পর্যায় হিসাবে মোদী সরকার IPC, CrPC ও Evidence Act-এর বদলে নতুন আইন প্রনয়ন করছেন। এমতাবস্থায়, হাইকোর্টের কার্যাবলী শুধুমাত্র ইংরেজি ভাষায় পরিচালনা সেই ঔপনিবেশিক দাসত্বের পরিচায়ক হয়ে থাকবে ঠিক যেমন আরেকটি দাসত্বের পরিচায়ক হলো ভারতের মত গ্রীষ্মপ্রধান দেশে কালো কোট, গাউন ও গলাবন্ধ পরে উকিলদের সওয়াল করা।

Wednesday, November 29, 2023

লক্ষ কন্ঠে গীতা পাঠের আগে কোরান পড়ুন

'হিন্দুত্ববাদী'দের উদ্যোগে ব্রিগেড ময়দানে 'লক্ষ কন্ঠে গীতাপাঠ'-এর অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থাকলেও এই অনুষ্ঠান, আমার কাছে, কোনও হিন্দুত্ববাদী কর্মসূচি নয়। এর পিছনে যশ, অর্থ, রাজনৈতিক স্বার্থ সহ একাধিক বিষয় থাকতে পারে কিন্তু ধর্ম রক্ষা বা হিন্দু স্বার্থ রক্ষা একেবারেই নেই। আমার এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে হিন্দুত্বের সার্টিফিকেটধারীরা আমাকে 'পতিত হিন্দু' বলে দাগাতে পারেন কিন্তু আমি মনে করি, লক্ষ কেন, কোটি কন্ঠেও গীতার বাছাই করা কয়েকটি অধ্যায় পাঠ করলে হিন্দুদের কোন উপকার হবে। কেন? এবার সেটাই বলছি।

প্রথমত, গীতা, যোগ বা আয়ুর্বেদের মত বিষয়গুলি হিন্দুদের proprietary নয়, বরং এগুলো সমগ্র বিশ্বকে সনাতন সংস্কৃতির উপহার। গীতা পাঠ ও তার উপলব্ধি একজন ইহুদি বা ফরাসি'কে ততটাই অনুপ্রাণিত করবে যতটা একজন হিন্দুকে। শ্রীমৎভগবতগীতা'র শিক্ষা সার্বজনীন। 

দ্বিতীয়ত, আমি মনে করি গীতা'র কয়েকটি বাছাই অধ্যায় পাঠের পরিবর্তে যদি কোরান শরীফের বাছাই কয়েকটি অধ্যায় পাঠ করা হতো তাহলে সেটা অনেক বেশী কার্যকর হতো। কারণ, গীতা পাঠের অনুষ্ঠানে গীতার মাহাত্ম্য ও সনাতন ধর্মের গরিমার কথা শুনে একদল ভাববে যে সনাতন ধর্ম এত মহান, সে নিশ্চয়ই অবিনশ্বর কিন্তু তারা ভুলে যাবে যে সনাতন ধর্ম এত মহান হওয়া সত্ত্বেও তার ধারণকারী ভূমির পরিমান কালেকালে কিভাবে সঙ্কুচিত হয়ে বর্তমান পরিস্থিতিতে এসেছে এবং এখনও সঙ্কুচিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে।

তৃতীয়ত, গীতার এই বাছাই কয়েকটি অধ্যায় পাঠের পরিণতিতে অন্যদল ভেবে নেবে যে গীতার মত অন্য ধর্মগ্রন্থগুলিতেও নিশ্চয়ই একই কথা বলা হয়েছে। তারা কোনদিন অন্যদের ধর্মগ্রন্থের একটা পাতা না উল্টেও, অন্ধের হস্তীদর্শনের মত, সেগুলি সম্পর্কে মনগড়া ধারণা তৈরী করে নেবে।

হিন্দুদের যদি গীতাপাঠ করতেই হয় তাহলে সেটা তারা ব্যক্তিগত উদ্যোগে করুক, সাংগঠনিকভাবে নয়। কোন ব্যক্তি নিজের চরিত্রের কতটা বিকাশ করতে চায় বা পারে সেটা একান্তই তার ব্যক্তিগত বিষয়। যদি এরকম উদ্যোগ সাংগঠনিকভাবে নেয়া হয় তাহলে সেক্ষেত্রে আমি কোরান পাঠের আয়োজনকে স্বাগত জানাবো। সেক্ষেত্রে হিন্দুদের 'সব ধর্মে একই কথা বলা আছে' এই ভ্রান্ত ধারণার অবসান হবে এবং তারা আশু বিপদ থেকে সতর্ক থাকতে পারবে। আর সেই কাজ যদি প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে হয় তাহলে সেটা বিরাট সাফল্য।

Wednesday, September 27, 2023

হিজাব সংস্কৃতি

শরীর এবং সমাজ - উভয়েরই একটা নিজস্ব গঠনতত্ত্ব থাকে, সেখানে কোন ফরেন এলিমেন্ট খুব সহজে গ্রহণযোগ্য হয়না। এই কারণেই হাজারটা ফ্যাক্টর মিলিয়ে কারুর লিভার বা হার্ট ট্রান্সপ্লান্ট হলেও অনেকক্ষেত্রেই গ্রহীতার শরীর সেটা মানিয়ে নিতে পারেনা। রোগীর মৃত্যুও হয়।


একইভাবে, সমাজ, জাতি সবারই একটা গঠনতন্ত্র আছে। বিদেশী সংস্কৃতি বা প্রথা সেখানে খুব সহজে প্রবেশাধিকার পায়না। এরকমই একটা বিদেশী সংস্কৃতি হলো হিজাব। মেয়েদের পর্দানশীন রাখা ভারতের সংস্কৃতি নয়। হিন্দুসমাজে পর্দাপ্রথার প্রচলন হয় মুসলিম আক্রমনের পরে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে ভারতের যেসব অঞ্চলগুলি দীর্ঘদিন মুসলিমদের অধীনে ছিল, সেখানেই এই পর্দাপ্রথার প্রচলন ঘটেছে। উত্তর ও পূর্বভারতেই তা প্রধানতঃ সীমাবদ্ধ। স্থানভেদে তার রুপ আলাদা – পাঞ্জাবে দোপাট্টা তো বাংলায় ঘোমটা। 


“এ দেশে মেয়েদের পর্দা নেই, কোনদিনও ছিলনা। উত্তর ভারতের এই ম্লেচ্ছ বর্বরতা মারাঠা দেশ কখনও স্বীকার করে নেয়নি।“ – না, এই কথাগুলি বালাসাহেব ঠাকরে বা কোন তথাকথিত উগ্রহিন্দুনেতার নয়। এ দাবী বাঙলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাণপুরুষ শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের। তিনি তাঁর মধুমালতী কাহিনীতে বামন রাওকে দিয়ে এই সত্য প্রকাশ করেছেন। এতে যদি কেউ শরদিন্দুবাবুকে উগ্রবাদী ভাবতে চান তো ভাবতেই পারেন, কিন্তু এতে সত্য বদলাবেনা।


ইসলামে নারীর অবস্থান শুধু ভোগ্যপন্য হিসাবে। নারীদের স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্রতার কোন স্থান সেখানে নেই। তাই নিজের ভোগের জিনিসকে অন্যের থেকে লুকিয়ে রাখার জন্যেই বোরখা ও হিজাবের প্রচলন। তার সৌন্দর্য্য যাতে অন্য কারুর দৃষ্টি আকর্ষন না করে তাই তাকে পর্দানশীন করার চেষ্টা। আর সম্প্রতি কর্ণাটক সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে হিজাব বিতর্কের সময় এই সাংস্কৃতিক বিভাজন'টা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। খোদ এই রাজ্যে বহু তথাকথিত 'সেকুলার'ও হিজাব মেনে নিতে পারেনি আর তাই হিজাব আজও ফরেন এলিমেন্ট।


এই 'ফরেন এলিমেন্ট' তকমা ঘুচিয়ে, হিজাব'কে বাঙালীর পরিচিত ও 'ঘরের জিনিস' করে তোলার লক্ষ্যেই নতুন ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে যার প্রমাণ নীচের ছবিতে স্পষ্ট। দোকানে, বাড়িতে বাঙালী যখন নিয়মিত এই শব্দটা দেখবে, সেই শাড়ি কিনবে, পরবে, তখন সেটা নিয়ে তার মানসিক জড়তা স্বাভাবিকভাবেই কমে যাবে। ঠিক যেভাবে সত্যনারায়ণ'কে সত্যপীর বানিয়ে তার ব্রতকথার শেষে "আমীন" ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে বা বনদেবী'কে বনবিবি বানিয়ে দেয়া হয়েছে।


এগুলো হলো সাংস্কৃতিক আগ্রাসন। আপনার অজ্ঞাতেই আপনার মননশক্তি'কে প্রভাবিত করার প্রয়াস। পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বিক্রিত (বিকৃতও বটে) পত্রিকাগোষ্ঠীর পোষ্য সাহিত্যিকরা দীর্ঘদিন ধরেই 'এ বাড়ির সিন্নির সাথে ও বাড়ির ফিরনি'কে মিলিয়ে এসেছেন কিন্তু এতকিছুর পরেও এপারে কালিয়াচক, ধুলাগড়, তেলেনিপাড়া, বাদুড়িয়া এবং ওপারে ব্রাহ্মণবেড়িয়া, নাসিরনগর ইত্যাদি বন্ধ হয়নি। কারণ শরীর হোক সমাজ, ফর্মুলাটা এক - গ্রহীতার মানিয়ে না নিয়ে মৃত্যু অবধারিত।

Thursday, September 21, 2023

মহিলা সংরক্ষণ আইন - উৎসাহ না অপমান?

🔴 ভারতের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ছিলেন বিশ্বের দ্বিতীয় মহিলা প্রধানমন্ত্রী। 


🟡 ভারতে দু'জন মহিলা, প্রতিভা দেবীসিং পাটিল ও দ্রৌপদী মূর্মু দেশের সর্বোচ্চ পদে আসীন হয়েছেন।


🟢 ভারতের ২৪ জন মহিলা বিভিন্ন রাজ্য/কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের রাজ্যপাল/লেঃ গভর্নর পদে আসীন ছিলেন অথবা আছেন।


🔵 ভারতে ১৬ জন মহিলা মুখ্যমন্ত্রী পদে আসীন হয়েছেন -

১.    সুচেতা কৃপালনী (উঃ প্রঃ)

২.    শশিকলা কাকোদকর (গোয়া)

৩.    আনয়ারা তৈমুর (আসাম)

৪.    নন্দিনী সতপথী (ওড়িশা)

৫.    মেহবুবা মুফতি (জঃ ও কাঃ)

৬.    শীলা দীক্ষিত (দিল্লি) 

৭.    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (পঃ বঃ)

৮.    মায়াবতী (উঃ প্রঃ)

৯.    রাজিন্দর কৌর ভাট্টাল (পাঞ্জাব)

১০.  জানকী রামচন্দ্রন (তাঃ নাঃ)

১১.  সুষমা স্বরাজ (দিল্লি)

১২.  রাবরী দেবী (বিহার)

১৩.  বসুন্ধরা রাজে (রাজস্থান)

১৪.  জয়ললিতা (তাঃ নাঃ)

১৫.  উমা ভারতী (মঃ প্রঃ)

১৬.  অনাদিবেন প্যাটেল (গুজরাট)


🟠 ভারতে ১০০ জনেরও বেশী মহিলা কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, সাংসদ, বিভিন্ন রাজ্যের মন্ত্রী, বিধায়ক ও বিধান পরিষদে আসীন আছেন বা ছিলেন।


প্রায় এক দশক ক্ষমতাসীন থাকার পর হঠাৎ একদিন মনে হলো যে রাজনীতিতে মহিলাদের সাথে বৈষম্য করা হচ্ছে আর পেশ করা হলো 'নারীশক্তি বন্দন অধিনিয়ম' বা মহিলা সংরক্ষণ আইন। শুধু পেশ হওয়া নয়, নতুন আইন প্রনয়নের ক্ষেত্রে প্রচলিত প্রথা ভেঙে, সেই বিল সিলেক্ট কমিটিতে না গিয়ে পাশও হয়ে গেল আর সেটাও কোন সংশোধনী ছাড়াই কারণ কোনও দলই লাভের গুড় ছাড়তে বা বিরাট সংখ্যক মহিলা ভোটারদের কাছে অপ্রিয় হতে রাজী নয়।


সংবিধানের এত বড় একটা সংশোধন হয়ে গেল কিসের ভিত্তিতে? এই সংশোধনী পেশ করার আগে সরকার কি রাজনীতিতে মহিলাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ নিয়ে কোন সার্ভে করিয়েছিল? ভারত ছাড়া পৃথিবীর আর কোন দেশে কি রাজনীতিতে মহিলাদের এত ব্যপক অংশগ্রহণ দেখা যায়? দু'টি প্রশ্নেরই উত্তর হলো - "না"। আধুনিক গণতন্ত্রের পীঠস্থান বলে পরিচিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও পর্যন্ত কোন মহিলাকে নিজেদের রাষ্ট্রপ্রধান বলে নির্বাচন করতে পারেনি কিন্তু ভারত সেটা হেলায় একাধিকবার করেছে আর তার একমাত্র কারণ হলো ভারত হিন্দুবহুল দেশ।


হ্যাঁ, কেবলমাত্র হিন্দুবহুল দেশ বলেই রাজনীতিতে মহিলাদের এই অংশগ্রহণ দেশবাসী খোলা মনে মেনে নিয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের থেকে বহুগুণ বেশী মহিলারা রাজনীতিতে সক্রিয় ও প্রশংসনীয় ভূমিকা নিয়েছেন। কারণ হিন্দুদের ইতিহাস, ঐতিহ্য, শিক্ষা ও সংস্কার মানুষের লিঙ্গের ভিত্তিতে বিচার করতে শেখায়না। কিন্তু দেশবাসীর এত সদর্থক মানসিকতার পরেও, প্রায় এক দশক শাসন করার পর, শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করতে নরেন্দ্র মোদী সরকার যখন "রাজনীতিতে মহিলাদের সাথে বৈষম্য"র অজুহাত দিয়ে আইনে বদল করেন তখন সেটাকে হিন্দুদের উদার মানসিকতার প্রতি অপমান ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না।

Monday, July 10, 2023

রাজনীতির সেফটি ভালব

বাড়িতে প্রেসার কুকার তো প্রায় সবারই আছে কিন্তু সেটাতে যে সেফটি ভালব, যেটাকে সাদা বাংলায় আমরা 'সিটি' বলি, থাকে সেটার উপযোগিতা কখনও খেয়াল করেছেন? এই 'সিটি' বা সেফটি ভালব'টা বানানো হয় প্রেসার কুকারের আয়ু ও নিরাপত্তার কথা ভেবে। নীচে থেকে আসা তাপে প্রেসার কুকারের ভিতর যে বাস্পের প্রবল চাপের সৃষ্টি হয় সেটা যদি জমতেই থাকে তাহলে কুকারটা ফেটে যাবে। কিন্তু রান্না সম্পূর্ণ করতে গেলে যতটা চাপের প্রয়োজন সেটা একবারে তৈরী হয়না। এই দ্বিমুখী চাহিদার কথা ভেবেই তৈরী হয়েছে সেফটি ভালব। কুকারের ভিতরে চাপ খুব বেড়ে গেলে কিছুটা বাস্প সেটা বের করে দেয়, ফলে কুকার নিরাপদ থাকে আর নীচের থেকে নিয়মিত তাপের ফলে পুনরায় যে বাস্পচাপ তৈরী হয় সেটা খাবারকে সুসিদ্ধ করে তোলে।


এই ফর্মুলা মেনেই অবসরপ্রাপ্ত ব্রিটিশ আমলা, অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস। ১৮৫৭ সালে সিপাহীদের গুঁতো খাওয়ার পরে আরেকটা বিদ্রোহ ব্রিটিশ রাজ সামলাতে পারতনা। তাই তদানীন্তন ভাইসরয়, লর্ড ডাফরিনের সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি এমন একটা মঞ্চ তৈরী করেন যা সশস্ত্র সংগ্রামের বদলে, আবেদনের মাধ্যমে দেশের মানুষের ক্ষোভ প্রকাশ করবে। লালা-বাল-পালের অন্যতম লালা লাজপত রায়ও ২০১৬ সালে প্রকাশিত তার ইয়াং ইন্ডিয়া বইতে একই কথা বলেছেন। হিউমের দূরদৃষ্টি যে প্রখর ছিল সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। বিশেষত বাল গঙ্গাধর তিলকের পর যখন গান্ধীর হাতে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ যায় তখন থেকেই কংগ্রেস বিপ্লবীদের - ভগৎ সিং হোক বা সুভাষ বোস - পিছন থেকে ছুড়ি মারতে শুরু করে।


পঞ্চায়েত নির্বাচনের প্রহসন দেখার পর আজ যারা শুভেন্দু অধিকারী'র কিছু বক্তব্যে নিজেদের অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণ বাড়াচ্ছেন তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই যে এটাই সেই সেফটি ভালব থিওরিরই একটা অংশ। ৩০৩ জন সাংসদ নিয়ে নীরব দর্শক হয়ে বসে থাকা মোদী-শাহ'র বিজেপি'র বিরুদ্ধে সমর্থকদের জমে ওঠা ক্ষোভ প্রশমনের এটা একটা উপায় মাত্র। কারণ নেতারাও জানে যে এই ক্ষোভের আয়ু বেশীদিন নয়। তাই ক্ষোভ যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে না চলে যায় তাই শুভেন্দু'র বাতেলা চলবে কিন্তু দিনের শেষে তারও ট্যুইটারে পিনড পোস্ট থাকবে মোদীর সাথে সাক্ষাতের ছবি। মেড়া তো তার খুঁটির জোরেই লড়ে, তাই না?

Saturday, June 24, 2023

বাঙালীত্ব

ভারতে, সঙ্ঘী আর কম্যুনিস্ট - উভয়ের কাছেই পৃথিবীটা দ্বিমাত্রিক। সঙ্ঘীদের কাছে "মছলিখোর বংগালী" সহী হিন্দু নয় আর ঠিক একইভাবে, কম্যুনিস্টদের কাছে, ভারতমাতার জয়ধ্বনি দেয়া বাঙালীরা আসল বাঙালী নয়।


এই কারণেই কিছু অমর্ত্য সেন বা সাগরিকা ঘোষের মত বাঙালীর দেশ বিরোধী কার্যকলাপের জন্যে সঙ্ঘীরা বাঙালী সমাজকে কাঠগড়ায় তুলতে পারে কিন্তু তিস্তা শীতলবাড় বা হেমন্ত কারকাড়ের জন্যে তারা সম্পূর্ন মারাঠা জাতিকে নিয়ে কদর্য মন্তব্য করেনা অথবা হর্ষদ মেহতা, কেতন পারেখ বা নীরব মোদীর জন্যে সব গুজরাটিকেই চোর বলেনা। আসলে পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলে সঙ্ঘীদের রাজনৈতিক অসাফল্য তাদের এই দুই জাতির বিরুদ্ধে আক্রোশের মূল কারণ।

উল্টোদিকে কম্যুনিস্টরা, যারা ভেনেজুয়েলাতে বৃষ্টি হলে কলকাতাতে ছাতা খুলে ঘোরে বা নিকারাগুয়ায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির উত্থানে পশ্চিমবঙ্গে বনধ ডাকে তারা কিন্তু কাশ্মীরে হিন্দু পন্ডিতরা জেহাদি অত্যাচারের কারণে গৃহচ্যুত হলে কোন প্রতিবাদ করেনা কারণ তারা বাঙালী নয়। ঘরের পাশে বাংলাদেশে অসহায় হিন্দু বাঙালীদের ক্রমাগত রাষ্ট্রীয় আক্রমণেও কম্যুনিস্টদের কোন বনধ ডাকতে দেখা যায়না। হয়ত নিকারাগুয়া বা কিউবার নাগরিকদের থেকে বাংলাদেশের হিন্দুরা কম বাঙালী।

কিন্তু সৌভ্যাগ্যের বিষয় হল যে এই দুই মতাদর্শের বাইরেও হিন্দু বাঙালীর অস্তিত্ব ছিল, আছে এবং তাদের সংখ্যাই প্রতিদিন বাড়ছে যারা মছলিও খায় আবার বজ্রনির্ঘোষ কন্ঠে ভারত মাতার জয়ধ্বনিও দেয়। যারা গঙ্গার পবিত্র জলে অবগাহন করে, মা কালীর মূর্তির সামনে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্যে জীবনদানের শপথ গ্রহণ করতো, যাদের কাছে "বন্দেমাতরম" এখনও একটা প্রেরণা। তাদের কাছে, শুধুমাত্র "জয় শ্রী রাম" বলাই হিন্দুত্বের পরিচায়ক নয়, "জয় মা কালী" হুঙ্কারও তাদের দেহে অ্যাড্রেনালিনের ক্ষরণ বৃদ্ধি করে। যাদের কাছে হিন্দুত্ব আর বাঙালিত্ব বিপ্রতীপ নয়, সমানুপাতিক ও পরিপূরক।

বকচ্ছপ

সারা পৃথিবীতে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার প্রেরণা মূলত দু'টি - অর্থ ও ক্ষমতা। সাধারণ হিন্দুরা, বিশেষত বাঙালীরা, সেটার সাথে আদর্শ'কে যোগ করে, 'রাজনৈতিক মতাদর্শ' নামক এমন একটা বকচ্ছপ বানিয়েছে যেটা তাদের না যোগাতে পারে অর্থ, না দিতে পারে ক্ষমতা বরং লাভের মধ্যে কেড়ে নেয় তাদের সামাজিক নিরাপত্তা।

সভ্যতা'র মাপকাঠি

সভ্যতার অগ্রগতি মানে শুধু উন্নত জীবনযাত্রা বা প্রযুক্তি নির্ভরশীলতা নয়, সভ্যতার অগ্রগতি মানে 'বিশ্বাস' থেকে 'কৌতূহল'-এ উপনীত হওয়া। সভ্যতা মানে নিজের অজ্ঞানতাকে স্বীকার করে, অজানাকে জানতে চাওয়া। সভ্যতা মানে আত্মকেন্দ্রীক মানসিকতা থেকে সার্বজনীন উন্নয়নে আগ্রহী হওয়া। সভ্যতা মানে স্মৃতি ও কল্পনার বশীভূত না হয়ে জীবন উপভোগ করা।

Tuesday, August 9, 2022

হর ঘর তিরঙ্গা

স্বাধীনতার ৭৫ বছর উপলক্ষে, দেশের অন্তত ২০ কোটি বাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগানোর জন্যে কেন্দ্র সরকার 'হর ঘর তিরঙ্গা' প্রকল্প নিয়েছে। এই প্রকল্পের অঙ্গ হিসাবে সব ডাকঘর থেকে জাতীয় পতাকা বিক্রি করা হচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এই প্রকল্পের অধীনে পতাকা সরবরাহের দায়িত্ব পেয়েছে সালাউদ্দিন মন্ডল। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত করার জন্যে ফ্ল্যাগ কোডে পরিবর্তন করেছে কেন্দ্র সরকার।

এখানে একটা কথা মনে রাখা দরকার যে প্রকল্পের সময়সীমা ১৩ থেকে ১৫ই আগস্ট হলেও জাতীয় পতাকার সম্মান কিন্তু চিরকালীন। তাই যারা এই প্রকল্পের অধীনে নিজেদের বাড়িতে জাতীয় পতাকা লাগাবেন তারা দয়া করে মাথায় রাখবেন যে ১৫ই আগস্টের পরেও যেন সেই পতাকা তার উপযুক্ত মর্যাদা পায়। বাড়ির উঠোনে বা রাস্তার পাশে পড়ে থাকা জাতীয় পতাকা শুধুমাত্র বিসদৃশ নয়, জাতির সম্মানের জন্যে যথেষ্ট অবমাননাকর।

প্রোফাইলে জাতীয় পতাকা লাগান, বাড়িতে পতাকা লাগান, ক্লাব, অফিস, দোকান - যেকোন যায়গাতেই জাতীয় পতাকা লাগান কিন্তু সেটা যেন কোন হুজুগের ফলে না হয়। জাতীয় পতাকা লাগানো তখনই সফল হবে যখন আপনার ভিতরে জাতীয় সত্ত্বার বিকাশ ঘটবে। জাতীয়তাবাদ জিনিসটা খুব একটা সস্তা নয়, এটা তাদেরই শোভা পায় যারা নিজেদের জাতীয় পরিচয় নিয়ে গর্বিত।

Sunday, July 17, 2022

অতীত নির্ভরশীলতা

অতীতের মৌতাতে কেবল তারাই বুঁদ হয়ে থাকতে পারে যারা ভবিষ্যতের ঝুঁকি নিয়ে ভয় পায়। ধীরুভাই কি করেছিলেন সেটা নিয়ে স্মৃতিমেদুর হয়ে থাকলে মুকেশ আম্বানি বিশ্বের অন্যতম ধনী হতেন না। শুধুমাত্র  সিনিয়র জর্জ বুশের শাসন নিয়ে গর্ব চালিয়ে গেলে জুনিয়র জর্জ বুশ আমেরিকার রাষ্ট্রপতি হতেন না। বাজপেয়ীর প্রথম অকংগ্রেসী প্রধানমন্ত্রী হওয়া নিয়ে মেতে থাকলে মোদী কখনই দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না।


অতীত যত সুখের বা আনন্দেরই হোক না কেন ভুলে গেলে চলবেনা যে সেটা অতীত। বর্তমান যদি শুধুমাত্র অতীত নির্ভর হয়ে যায় তাহলে ভবিষ্যৎ বিপন্ন হতে বাধ্য। মাধ্যমিকে স্টার মার্কস পাওয়া কোন শিক্ষার্থী যদি সেই আনন্দে বুঁদ হয়ে থাকে তাহলে উচ্চমাধ্যমিকে তার ফল কি হবে সহজেই অনুমেয়। অতীত প্রেরণা হতে পারে, শিক্ষা হতে পারে কিন্তু বর্তমানের নির্ণায়ক হতে পারেনা কারণ অতীত থেকে বর্তমানের মধ্যে একটা বিরাট পার্থক্য আছে আর সেটা হলো মহাকাল।


অতীত আঁকড়ে থেকে যারা সময়ের সাথে সাথে নিজেদের জীবনযাত্রা বা আচরণে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে না পারে তারা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনা। বিশালদেহী ডাইনোসর বা ম্যামথরা পারেনি, হিন্দুরাও পারবেনা। গান্ধার থেকে ব্রহ্মদেশ অবধি বিস্তৃত ভারতের গরিমায় ডগমগ হিন্দুরা প্রায়শই ভুলে যায় যে গান্ধার বা ব্রহ্মদেশ - কোনটাই আজ ভারতের অঙ্গ নয়। হিন্দুদের বোঝা উচিত যে অতীতে দেশের বিরাট বিস্তৃতি যেমন সত্য ঠিক তেমনই সত্য তাদের বিযুক্তি। তারমানে অতীতে এমন ভুল নিশ্চয়ই হয়েছে যার পরিণতিতে দেশের সীমা সঙ্কুচিত হয়েছে। এমতাবস্থায়, শুধু "মা যা ছিলেন" নিয়ে গর্ব যথেষ্ট নয়। একইসাথে, "মা যা হয়েছেন" সেটার কারণও মনে রাখা দরকার যাতে "মা যা হইবেন" স্বপ্ন সফল হতে পারে।